বই নেই তবুও উৎসবের প্রস্তুতি,উদ্বিগ্ন অভিভাবক

0

আকরামুজ্জামান ॥ যশোরে চাহিদার ৭৫ শতাংশ বই এখনো পৌঁছেনি। তারপরও চলছে বই উৎসবের প্রস্তুতি। এ নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সকলেই হতাশ। কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ বই মিলবে তার নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কেউ। একের পর এক সংকটের কারণে নাকাল হয়ে পড়ছেন অভিভাবকরা। চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেই বাড়তি ফি দিয়ে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে ভর্তির পাশাপাশি যাবতীয় শিক্ষা উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষতো বটেই, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। এ অবস্থায় নতুন বছরে বই নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। সরকারের পক্ষ থেকে বছরের প্রথমদিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার বিষয়ে ঢাকঢোল পেটানো হলেও যশোরে চাহিদার ৭৫ শতাংশ বই এখনো আসেনি। বই সংকটের আশঙ্কায় অভিভাবকরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। জেলা প্রাথমিক অফিস সূত্রে জানাগেছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যশোরে চাহিদার মাত্র ২৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ বই এসেছে। মাধ্যমিক স্তরে এসেছে মাত্র ২৫ শতাংশ বই। এ পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে বছরের প্রথমদিন বই উৎসবে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই নতুন বই পাবে না। যদিও শিক্ষা অর্ফিস থেকে বলা হচ্ছে, আগামী ৩০ তারিখের মধ্যে শতভাগ না হলেও ৭৫ শতাংশ বই পাওয়া যাবে।
জেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা পর্যায়ে যশোর জেলায় সম্ভাব্য ৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের জন্যে ৫৪ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫টি বইয়ের প্রয়োজন। এরমধ্যে যশোরে মাধ্যমিক, দাখিল, এবতেদায়ী, এসএসসি ভোকেশনাল ও দাখিল ভোকেশনালে বইয়ের চাহিদা ৪১ লাখ ৪৯ হাজার ৯০২ পিস। চাহিদার বিপরীতে জেলায় বই এসে পৌঁছেছে ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ৬২৩ পিস। প্রাথমিক বইয়ের চাহিদা ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭৩টি। অথচ পৌঁছেছে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ২০৫ পিস বই।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুস সালাম বলেন, বই নিয়ে এখনো আশা হারাইনি। মন্ত্রণালয় থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে বই পর্যায়ক্রমে পৌঁছে দেয়া হবে। আমরা প্রতিদিনই যোগাযোগ রাখছি। সব বই পাওয়া না গেলেও বই উৎসবে সকল শিক্ষার্থীর হাতে সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বই তুলে দেয়া হবে।
প্রায় একই কথা বলেন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার একে এম গোলাম আযম। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কিছু বই এসেছে। সামনে কয়েকদিনের মধ্যে আরও কিছু বই আসবে। আস্তে আস্তে সব বই পৌঁছে যাবে। নতুন বছরে শিক্ষার্থীরা যাতে বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে সে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ফলে অভিভাবকদের এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
শিক্ষা বিভাগের একটি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর অর্ধেক বই দিয়েও বই উৎসব করা সম্ভব হবেনা। গত বছর পূর্ণাঙ্গ বই পেতে শিক্ষার্থীদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়। এ বছর তার চেয়েও বেশিদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোর জেলা শিক্ষা অফিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা মন্ত্রণালয়ে বইয়ের জন্যে চাহিদা পাঠিয়ে বারবার যোগাযোগ করলেও সেখান থেকে বই দেয়া হচ্ছেনা। কবে নাগাদ দেয়া হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এদিকে বছরের শুরুতে ছেলে-মেয়েদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া নিয়েও শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাকরাও চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অনেক অভিভাবক পুরনো বই সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। যশোর শিক্ষাবোর্ড সরকারি স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর পিতা মনিরুজ্জামান বলেন, তার ছেলে এ বছর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছে। এজন্যে তিনি পুরনো বই সংগ্রহের জন্যে কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করেছেন। কারণ এ বছর কাগজের সংকটের কারণে চাহিদামতো বই ছাপানো সম্ভব হয়নি। তাই তিনি ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
একই কথা বলেন, যশোর জিলা স্কুলের ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থীর পিতা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, করোনার দুই বছর এমনিতে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার সংকট ছিল। গত এক বছর বিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলেও শিক্ষা উপকরণের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে আমরা চরম সমস্যায় আছি। এরই মধ্যে নতুন চিন্তায় ফেলেছে ছেলে-মেয়েদের বই নিয়ে। সামনে বড় সংকট হতে পারে।  কালেক্টরেট স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা শরিফা খাতুন বলেন, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে আমরা চরম সমস্যায় আছি। এমনিতে শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে। তারপরও নতুন বছরে টিউশন ফি বাড়ানো হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এ অবস্থায় বছরের শুরুতে বই সংকট আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলছে।