নতুন কোনো সামাদের যেন জন্ম না হয়

0

 

গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ সড়কের ২ নম্বর বাড়ির নিচতলায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে শরীফ উল্লাহ নামে এক ব্যবসায়ী খুন হন। নিরাপত্তাকর্মী ও জনতা খুনি ছিনতাইকারীকে আটক করে। শুক্রবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আটক সামাদ ছিনতাই ও হত্যার কথা স্বীকার করেছে। জানিয়েছে, বিভিন্ন সময়ে সে বিভিন্ন ধরনের কাজ করত। সম্প্রতি কাজ না থাকায় সে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এজন্য সে ছিনতাইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। সে গাজীপুরের পুবাইলের বদুগাঁও গ্রামে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকে। তার দুটি সন্তান রয়েছে। একটি সন্তান প্রতিবন্ধী। আর্থিক অনটনে পড়ে ছিনতাইয়ের জন্য সে বিভিন্ন এটিএম বুথের সামনে ঘুরতে থাকে। ওইদিন রাতে সে উত্তরায় আসে এবং ছিনতাই করতে গিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটায়। পুলিশ বলেছে, সামাদ পেশাদার ছিনতাইকারি নয়। তার অপরাধের আগের কোনো রেকর্ড নেই। পুলিশ ও সামাদের বক্তব্য প্রমাণ করে সামাদ অবস্থার শিকার। তারপরও বলতে হবে নিঃসন্দেহে এ ঘটনা অপরাধমূলক ও গর্হিত কাজ। তবে এ ঘটনা ঘটানো এবং জড়িয়ে পড়ার পেছনের কারণটিও উপেক্ষা করার নয়।
এর পেছনে রয়েছে, নির্মম বাস্তবতা অভাব-অনটন ও বেকারত্বের হতাশা। এ ঘটনা শুধু একটি এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সমাজের সার্বিক চিত্রের অনিবার্য প্রতিফলন। করোনার অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া অর্থনীতি, বেকারত্ব এবং অভাব-অনটনের সাথে পাল্লা দিয়ে পণ্য মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধিতে অসংখ্য মানুষের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সার্বিক অর্থনীতিকে আরও অবনতির দিকে নিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতিতে দিনমজুর থেকে শুরু করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিদারুণ কষ্টে জীবনযাপন করছে। অবস্থাপন্নরাও এর শিকার। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, করোনার কারণে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারি অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবীদের ছাঁটাই ও বেতন কমিয়ে দেয়া হয়েছে। দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, দারিদ্র্যসীমা বাড়ছে। প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা দরিদ্র হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ এক দিশাহারা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যেই সরকারিভাবে তেল, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সারসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে পেয়েছে যে, অসংখ্য মানুষ একবেলা খাবার কমিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছে না। অনেকে খরচ কমাতে মাছ-গোশত বাদ দিয়ে ডাল-ভাত নির্ভর হয়ে পড়েছে। সন্তানদের চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ সামলিয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট কর্ম হারানো ও কর্মপোযোগী বেকারদের মধ্যে রাজ্যের হতাশা নেমে এসেছে।
একথা সবাই জানি, মানুষ যখন অভাব-অনটনের মধ্যে পড়ে সংসার চালাতে পারে না, তখন তাদের মন-মেজাজ স্বাভাবিক থাকে না। স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে। একটা চিন্তাই কাজ করে যেকোনো উপায়ে সন্তান ও পরিবারকে বাঁচাতে হবে। মানসিক এই প্রবল চাপ অনেকের পক্ষে সমাল দেয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে অপরাধমূলক কাজে জড়াতে দ্বিধা করে না। সামাদ যে ছিনতাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় এবং খুনে জড়িয়ে পড়ে, তার জন্য নিরুপায় পরিস্থিতি দায়ী। বর্তমানে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে অত্যন্ত শোচনীয় তা বুঝিয়ে বলার কিছু নেই। অর্থনৈতিক টানাপড়েন তীব্র হওয়ায় সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে নানা ধরনের নেতিবাচক ঘটনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। অভাব-অনটনের কারণে যেসব অপরাধমূলক ঘটনায় মানুষ জড়ায়, তা সামাল দেয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ হচ্ছে, পেশাদার অপরাধী সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকে। কিন্তু পেটের দায়ে গলা কাটার খবর তাদের জানা থাকে না। কারণ, বেকারত্ব ও অভাব-অনটনের কারণে অপরাধমূলক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে তাকে আগে থেকে চিহ্নিত করা সমআভব নয়। অথচ, এখন শহর গ্রাম সর্বত্র সামাদের জন্ম হচ্ছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। আমরা সামাদের মুক্তি দাবি করছি না। বিচারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন । তবে আমরা চাই নতুন নতুন সামাদ যেন জন্ম না নেয়। বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে।