যশোরে গর্ভের সন্তানের মৃত্যু ঘটানো চেষ্টার অভিযোগে মামলা তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরে পরষ্পর যোগসাজসে শেখ নাজমুন নাহার সুমি নামে এক নারীর গর্ভের সন্তানের মৃত্যু ঘটানোর উদ্দেশ্যে ওষুধ সেবন করানোর অভিযোগ এনে ৩ জন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার আদালতে মামলা হয়েছে। ওই নারীর ভাই শেখ শাওন মাহমুদ মামলাটি করেছেন। তিনি বাঘারপাড়া উপজেলার পাঠান পাইকপাড়া গ্রামের শেখ লুৎফর রহমানের ছেলে। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. মঞ্জুরুল ইসলাম অভিযোগটি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) আদেশ দিয়েছেন।
আসামিরা হলেন-যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনের অসিম ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালের গাইনী বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. নিলুফার ইয়াসমিন এমিলি, ডা. মো. আবু সাঈদ (রেডিওলজিস্ট অ্যান্ড ইমাজিং) ও ডা. এ কে এম আব্দুল আওয়াল (কনসালটেন্ট ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি)।
শেখ শাওন মাহমুদ মামলায় উল্লেখ করেছেন, বাঘারপাড়া উপজেলার খলসী গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে রবিউল ইসলামের সাথে তার বোন শেখ নাজমুন নাহার সুমিকে বিয়ে দেন। কিন্তু দীর্ঘদিন তাদের কোনো সন্তান না হওয়ায় ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সুমি ও রবিউল অসিম ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে গিয়ে গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. নিলুফার ইয়াসমিন এমিলির শরনাপন্ন হন। ডা. এমিলি তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর চিকিৎসাপত্র দেন। সেই সাথে তাদেরকে একই বছরের ৪ নভেম্বর দেখা করতে বলেন। নির্ধারিত দিনে সুমি ও রবিউল দম্পতি ডা. এমিলির চেম্বারে এলে তিনি ফের তাদেরকে চিকিৎসাপত্র প্রদান করেন। এবার ওই দম্পতিকে চলতি বছরের ১৭ মার্চ দেখা করার জন্য পরামর্শ দেন ডা. এমিলি। যথারীতি ১৭ মার্চ তারা ডা. এমিলির শরনাপন্ন হলে তিনি সুমির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পর জানান, তার সন্তান কন্সসিভ করেছে। বিষয়টি আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি সুমিকে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাম করার পরমর্শ দেন। পরে সুমি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাম করে আনলে এসব রিপোর্ট দেখে ডা. এমিলি মতামত দেন যে, গর্ভের সন্তানের বয়স ৫ সপ্তাহ ৬ দিন। সন্তানটি সুস্থ আছে এবং ডেলিভারির তারিখ নির্ধারণ করা হয় আগামী ১১ নভেম্বর। এরপর গত ২৯ মার্চ সুমির সামান্য রক্তক্ষরণ হলে সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কায় ভেঙ্গে পড়েন সুমি। তিনি দ্রুত ডা. এমিলির শরনাপন্ন হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেয়া হয়। এরপর ৩১ মার্চ ডা. এমিলির চেম্বারে দেখা করেন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী ডা. মো. আবু সাঈদের কাছে আলট্রাসনোগ্রাম ও ডা. এ কে এম আব্দুল আওয়ালের কাছে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করান সুমি। ডা. মো. আবু সাঈদ তার দেয়া আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে উল্লেখ করেন, সুমির গর্ভের সন্তান এবারশন হয়েছে। ডা. এ কে এম আব্দুল আওয়ালও তার দেয়া রিপোর্টে অনুরুপ মতামত প্রদান করেন। ডা. এমিলি এসব রিপোর্ট দেখে কোনো চিন্তাভাবনা না করেই এবং অন্য চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা না নিয়ে সুমিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেন। গত ১ এপ্রিল অসিম ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সুমির গর্ভপাত ঘটানোর জন্য পর্যায়ক্রমে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। একটানা ৩ দিন ধরে ওষুধ সেবনের পরও গর্ভপাত না হলেও এর প্রেক্ষিতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সুমি। তার জরায়ুর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ৩ এপ্রিল স্বজনেরা সুমিকে সেখান থেকে কুইন্স হসপিটালে নিয়ে যান এবং গাইনী ককনসালটেন্ট ও সার্জন ডা. নার্গিস আক্তারকে দেখানো হয়। এরপর তার পরামর্শে সুমির আলট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। রিপোর্ট দেখে ডা. নার্গিস আক্তার স্বজনদের জানান যে, সুমির গর্ভের সন্তান সুস্থ আছে। তবে সুমির শারীরিক অবস্থা ও জরায়ুর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। তিনি তার চিকিৎসাপত্র প্রদান করেন। বর্তমানে সুমিকে সুস্থ করতে তার পরিবারের দৈনিক প্রায় ৫ হাজার টাকার ওষুধ বাবদ খরচ করতে হচ্ছে। যা তার পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, উল্লিখিত আসামিরা পরষ্পর যোগসাজসে সুমির গর্ভের সন্তানের মৃত্যু ঘটানোর উদ্দেশ্যে ওষুধ সেবন করিয়েছেন। এ কারণে মামলাটি আমলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগ বিষয়ে ডা. নিলুফার ইয়াসিন এমিলি বলেন, ওই রোগী গত ৩১ মার্চ তার চেম্বারে এসেছিলেন। তখন তার গর্ভে কোনো সন্তান ছিলো না। তবে সন্তানের থলে দেখতে পাওয়া যায়। তখন রোগীরা বলেছিলেন, থলে রেখে কী লাভ। এ কারণে উভয়পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে থলে অপারেশন করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, সন্তান মেরে ফেলে আমার কী লাভ ? রোগীরা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলছেন।