রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আইসিজে-তে মিয়ানমার জান্তার ভূমিকা

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ সামরিক নেতৃত্বাধীন “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” এর পর মিয়ানমার থেকে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়াতে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা একপ্রকার পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচান। এর পর ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) একটি মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় ১৯৪৮ এর গণহত্যা কনভেনশন-এর নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে, রোহিঙ্গাদের আরও নৃশংস আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আদালত সর্বসম্মতভাবে আইন আনার ওপর জোর দেয়। কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মিয়ানমারের তৎকালীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি-এর নেতৃত্বাধীন সরকার আদালতের এখতিয়ার এবং আবেদনের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে প্রাথমিক আপত্তি দাখিল করে।
ICJ সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, ২১-২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রেট হল অফ জাস্টিসে একটি নতুন রাউন্ডের শুনানির আয়োজন করা হবে । যেখানে শাসকপক্ষকে সম্ভাব্য বিবাদী পক্ষ হিসেবে ধরা হয়েছে। এই জল্পনা ছড়িয়েছে যে, মিয়ানমারের বর্তমান সংকটের কথা বিবেচনা করে আদালত শুনানির সময়ে একটি কড়া অবস্থান নিতে পারে।
এটি লক্ষণীয় যে জান্তা-গঠিত রাজ্য প্রশাসনিক পরিষদ (SAC) এবং জাতীয় ঐক্য সরকার (NUG) ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের পর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য লড়াই করছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা যখন উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর আক্রমণের অভিপ্রায় ছিল গণহত্যা, তখন অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার এবং সামরিক বাহিনী উভয়ই অভিযোগ অস্বীকার করে। এমনকি ২০১৯ সালেও সু চি ব্যক্তিগতভাবে গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে, অপরাধের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে রক্ষা করার জন্য শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন। যাইহোক, সেনাবাহিনীর অধিগ্রহণ মিয়ানমারের “আধা-গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া”কে শেষ করে দিয়েছে, যা তাকে জাতিসংঘের শীর্ষ বিচার সংস্থা ICJ-তে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে বাধা দেয়। ইতিমধ্যে সামরিক প্রশাসন গণহত্যার মামলায় নিজেদের গা বাঁচাতে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উন্না মং লুইন-এর নেতৃত্বে একটি নতুন আইনি দল গঠন করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মিয়ানমারের অবৈধ সামরিক শাসনের প্রতিনিধিত্ব গ্রহণ করা কিয়াও মো টুনকে (NUG-এর সাথে সংযুক্ত) সরিয়ে দেবার পাশাপাশি জান্তার প্রমাণপত্রকে প্রত্যাখ্যান করেছে , সেই সঙ্গে তাতমাদাওকে মিয়ানমারের সঠিক প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকার করেছে। যদিও জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘের সংস্থা বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে জান্তা সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও ICJ এর এখতিয়ার নেই আইনত মিয়ানমারেরকে প্রতিনিধিত্ব করবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন 396 (V) (1950) নির্দিষ্ট করে যে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শংসাপত্র কমিটির সিদ্ধান্তটি জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাগুলিকেও জানাতে হবে । আদালত ২০২১ সালের জুনে গৃহীত জাতিসংঘের প্রস্তাবকে উপেক্ষা করতে পারে না যা অভ্যুত্থানকে কড়া ভাষায় নিন্দা করেছিল এবং মিয়ানমারে সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক বেসামরিক সরকারের দাবি করেছিল। যে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করবে তাকে অবশ্যই তার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।
ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পর থেকে রাখাইন, চিন, কাচিন, শান এবং কাইনের রাজ্যে জান্তার গণহত্যা এবং নৃশংসতার পরে, মিয়ানমারের জনগণ স্পষ্টভাবে সেই সামরিক শাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আনা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ -এর অভিযোগ স্পষ্ট। NUG দ্বারা জারি করা একটি সাম্প্রতিক বিবৃতি অনুসারে, আদালত একটি “বিপজ্জনক নজির” স্থাপনের ঝুঁকি নিয়েছে যা রোহিঙ্গা সহ মিয়ানমার এবং এর জনগণের জন্য ক্ষতিকর হবে। জান্তা জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার মধ্যে এবং তার বাইরেও মিয়ানমারের বৈধ সরকার হিসাবে বিচারযোগ্য স্বীকৃতি পেতে এই শুনানিকে কাজে লাগাবে। একইভাবে, এটি মিয়ানমারে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধারের দাবি করা সুশীল সমাজের কাছে একটি ভয়ানক বার্তা পাঠাবে। ICJ সভাপতির কাছে একটি যৌথ চিঠিতে, Fortify Rights এবং Myanmar Accountability Project (MAP) সহ লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড (LAW), যুক্তি দিয়েছিল যে জান্তাকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আদালত যদি সম্মতি দেয় তাহলে জান্তার বেআইনি দখলকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়বে । গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠিতে বাংলাদেশের কক্সবাজার ক্যাম্পের ৮০৭ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী ICJ-এর প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেছেন , জান্তাকে বৈধতা দেবার আগে বিষয়টি একাধিকবার পুনর্বিবেচনা করার জন্য। আইনি প্রক্রিয়ায় জান্তার প্রতিনিধিত্ব ICJ রায়ের বাস্তবায়নকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ আরাকান বা রাখাইন রাজ্যের কর, রাজস্ব সংগ্রহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীর ওপর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। আরাকান আর্মি (আরাকানে অবস্থিত একটি জান্তা বিরোধী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন) ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করার দাবি করে। তারা রাখাইন রাজ্যের প্রশাসন এবং জনসংখ্যা উভয়ের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করে। ICJ এর কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে জান্তার ব্যর্থতাও নোট করা উচিত। রাখাইন রাজ্যের বুথিডাং টাউনশিপের জান্তা-চালিত সাধারণ প্রশাসন বিভাগের জারি করা একটি আদেশে প্রকাশিত জান্তার দাখিল করা নতুন প্রমাণগুলি রোহিঙ্গাদের জীবিকা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য অ্যাক্সেসে বাধা দেওয়ার কঠোর অস্বীকৃতি প্রদর্শন করে। অন্যদিকে জাতীয় ঐক্য সরকার (NUG ) সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য দুটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছে। প্রথমটি, সব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার দিতে সম্মত হয়েছে এবং দ্বিতীয়টি রোহিঙ্গা জনগণের বিরুদ্ধে অতীতের নৃশংসতার কথা স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার সমস্ত প্রাথমিক আপত্তি প্রত্যাহার করেছে। তাই, ICJ যদি NUG-এর অনুরোধ বিবেচনা করে তাহলে প্রাথমিক আপত্তি খারিজ হয়ে যাবে । একইভাবে, কিয়াও মো টুনকে ICJ মিয়ানমারের আইনী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অনুমতি দিলে তিনি আদালতকে তার কাছে থাকা সমস্ত প্রমাণ সরবরাহ করতে পারবেন, যা কার্যকরভাবে সময়সূচির মধ্যে মূল মামলাটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সহায়ক হবে । NUG-এর বা জান্তার প্রতিনিধির আদালতের কার্যক্রমে সরাসরি কোনো ব্যবহারিক প্রভাব নেই । সুতরাং, যারাই মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করুক , আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ ) একটি বিষয় ভুললে চলবে না রাখাইনে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল।