গাড়ি চাপায় ৫ সহোদরের মৃত্যু: পিকআপ চালাচ্ছিল লাইসেন্সবিহীন চালক

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ কক্সবাজারের চকরিয়ায় একই পরিবারের ৯ জনকে চাপা দেয়া সেই পিকআপের চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। লাইসেন্স ছাড়াই তিনি দুইবছর ধরে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চালিয়ে আসছিলেন। এছাড়া যে পিকআপটি চালাচ্ছিলেন সেই পিকআপের ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন ছিল না। তিনবছর ধরে রুট পারমিটও মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ আগে তিনি ওই পিকআপটি চালানো শুরু করেছিলেন। ঘটনার দিন চকরিয়া থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে সবজি বোঝাই পিকআপ নিয়ে তিনি রওনা হন। ঘন কুয়াশা থাকার পরও বেপরোয়া গতিতে পিকআপ চালাচ্ছিলেন। এর আগে থেকেই মালুমঘাট বাজারের নার্সারি গেটের সামনে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ৯ ভাই-বোন। কিন্তু ঘন কুয়াশা ও অতিরিক্ত গতির কারণে কারণে তাদের দেখতে পাননি চালক। অধিক গতি থাকার কারণে কাছাকাছি এসে লক্ষ্য করলেও পিকআপটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে দুর্ঘটনাটি ঘটান। এ সময় তার সঙ্গে মালিকের ছেলে ও ভাগিনা ছিলেন। দুর্ঘটনার পর মালিকের নির্দেশনায় চালক আত্মগোপনে চলে যান। চারদিন পর র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ঘাতক সেই চালককে গ্রেপ্তার করেছে। ঘাতকের নাম সাইফুল ইসলাম। মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ দুপুরে রাজধানীর কাওরান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট নামক স্থানে একটি পিকআপের চাপায় প্রথমে ৪ সহোদর অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫) ও চম্পক সুশীল (৩০) ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেক সহোদর সরণ সুশীলের (২৪) মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরেক ভাই রক্তিম সুশীল ও বোন হীরা সুশীল। বর্তমানে রক্তিম সুশীল চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। এর আগে ৩০শে জানুয়ারি নিহতদের পিতা সুরেশ চন্দ্র সুশীল বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। ঘটনার দিন ভোরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অংশ হিসেবে পূজা শেষ করে ৯ ভাই-বোন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মালুমঘাট বাজারের নিকট রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ভোর ৫টার দিকে কক্সবাজারমুখী বেপরোয়া গতিতে আসা একটি পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মূল সড়ক থেকে নেমে গিয়ে তাদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থল থেকে চালক পালিয়ে যান। ওই ঘটনায় নিহতদের ভাই প্লাবন সুশীল (২২) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পিকআপচালককে আসামি করে কক্সবাজারের চকরিয়া থানায় সড়ক পরিবহন আইনের ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। র‌্যাব জড়িতদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১৫ এর অভিযানে শুক্রবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ঘাতক পিকআপের চালক সহিদুল ইসলাম ওরফে সাইফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বান্দরবানের লামার আলী জাফরের ছেলে।
মঈন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চালক সাইফুল গাড়ি চাপা দেয়ার ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার দিন ভোরে তারেক ও রবিউল নামের দুই ব্যক্তিকে নিয়ে পিকআপটি চালাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় পিকআপটি ঘণ্টায় প্রায় ৬৫-৭০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল। থামানোর জন্য ব্রেক করলেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদেরকে চাপা দিয়ে পিকআপটি প্রায় ১০০ ফুটের মতো সামনে চলে যায়। পরে সাইফুল পিকআপ থেকে নেমে নিহতদের দেখতে এলেও মালিকের ছেলে তারেকের নির্দেশে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
তিনি বলেন, সাইফুলের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও দীর্ঘ দুইবছর ধরে তিনি পিকআপ, চাঁন্দের গাড়ি ও ৩ টনের ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চালাচ্ছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে তিনি পিকআপটি মালিকের কাছ থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে চালানো শুরু করেন। দুর্ঘটনার পর সাইফুল মালুমঘাট বাজারের একটি স্থানে পিকআপ থামিয়ে মালিককে কল করে বিষয়টি জানান। মালিক তাকে পিকআপটি কোনো এক স্টপেজে রেখে লোকাল বাসে করে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাইফুল ডুলাহাজারায় এসে পিকআপটি রাখেন এবং লোকাল বাসে করে চকরিয়া গিয়ে মালিকের সঙ্গে দেখা করেন। মালিকের পরামর্শে বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন শেষে ঢাকায় আসেন।
সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব জানায়, পিকআপের মালিক মাহামুদুল করিম সবজি পরিবহনের ব্যবসা করেন। তিনি চকরিয়ার সবজির আড়ত থেকে কক্সবাজার সদর ও মহেশখালী এলাকায় সবজি সরবরাহ করতেন। তার ছেলে তারেক সবজি সরবরাহের তদারকি করতেন এবং ভাগিনা রবিউল তারেকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ২০১৬ সালে তিনি পিকআপটি কেনেন। গত ৪ বছর ধরে পিকআপের ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন এবং গত ৩ বছর ধরে রুট পারমিট মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। দুর্ঘটনার পর থেকেই পিকআপের মালিক, তার ছেলে তারেক ও ভাগিনা রবিউল আত্মগোপনে রয়েছেন। এ ঘটনার সঙ্গে কোনো পূর্ব শত্রুতা ছিল কিনা জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন কোনো তথ্য মেলেনি। ঘন কুয়াশা ও অতিরিক্ত গতির কারণে চালক সাইফুল সামনের কাউকে দেখতে পাননি। অধিক গতির কারণে কাছাকাছি এসেও ব্রেক করে পিকআপটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।