পার্টনারশিপ ডায়ালগের প্রস্তাব: ওয়াশিংটনের সাড়ার অপেক্ষায় ঢাকা

0

মিজানুর রহমান॥ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাব এবং সংস্থাটির ৭ কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা ফোরামে আলোচনায় আগ্রহী বাংলাদেশ। বিশেষ করে মন্ত্রী-সচিব পর্যায়ের সফর বিনিময় এবং রুটিন বৈঠকগুলোর সফল বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে ঢাকা। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা আশা করছেন, বন্ধু এবং উন্নয়ন অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্কে ‘নিষেধাজ্ঞা’ যে ছায়া ফেলেছে তা সরাতে পারস্পরিক বোঝাপড়াই একমাত্র বিকল্প। আর এতে দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নিয়ে দেশটির সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা জরুরি। সে লক্ষ্যেই ৩ বছর ধরে ঝুলে থাকা বাৎসরিক সংলাপ ‘পার্টনারশিপ ডায়ালগ’ আয়োজনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। অল্টারনেটিভ ভেন্যুতে অনুষ্ঠেয় সংলাপটি এবার ঢাকায় হওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। সে কারণে হোস্টের তরফে ২২ বা ২৩শে মার্চ পার্টনারশিপ ডায়ালগ আয়োজনের প্রস্তাব সংক্রান্ত নোট পাঠানো হয়েছে। যদিও ওয়াশিংটনের তরফে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে হ্যাঁ বা না কোনোটাই বলা হয়নি।
এ বিষয়ে ঢাকার এক কর্মকর্তা বলেন, সংলাপটি আগামী মাসের তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহে হবে এটা ধরেই বাংলাদেশ সরকার এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে। বাংলাদেশ প্রস্তাবিত তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর এবং বৈঠকে কোনো অসুবিধা আছে কিনা? তা জানাতে ওয়াশিংটন হয়তো কিছু সময় নিচ্ছে। প্রস্তাবিত তারিখের আগে বা পরে বৈঠক হলেও ঢাকার কোনো আপত্তি থাকবে না। ওই বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিবেন। আর মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেয়ার কথা স্টেট ডিপার্টমেন্টের রাজনীতি বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড। ওই সংলাপের আগেই ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস তার মিশন শুরু করবেন বলেও আশা করে সেগুনবাগিচা। কর্মকর্তারা বলছেন, সেই অর্থে পিটার হাসের প্রথম অ্যাসাইনমেন্টই হবে দুই পক্ষের জন্য মঙ্গলকর একটি রাজনৈতিক সংলাপের চেষ্টা করা। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন সংলাপ যখনই হোক সেখানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। তাছাড়া দুই দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট অন্য যেসব অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে তা নিয়েও কথা হবে। আসন্ন সংলাপে কি কি বিষয় নিয়ে কথা হতে পারে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, আলোচ্যসূচি নির্ধারণে চিঠি চালাচালি চলছে। যেহেতু সংলাপটি বাংলাদেশে হবে তাই এজেন্ডা চূড়ান্ত করবে ঢাকা। প্রথাগত বিষয়গুলোর পাশাপাশি গত তিন বছরে যে পরিবর্তন এসেছে সেগুলো নিয়েও আলোচনা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, গত তিন বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ডেমোক্র্যাট সরকার, কোভিড মহামারি ও সর্বশেষ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। ২০১৯ সালের সর্বশেষ সংলাপের এজেন্ডায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক, সুশাসন, রোহিঙ্গা সমস্যা, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়টি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমন, সাইবার নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ কমন ইস্যুতে শুরু থেকেই আলোচনা চলছে। তবে সর্বশেষ সংলাপে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট (জিসমিয়া) সইয়ের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে এবারো আলোচনা হতে পারে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ইন্দো-প্যাসিফিক, শ্রম নীতিমালার বাস্তবায়ন, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে আসন্ন সংলাপে। ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে কয়েক বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। শেষ পার্টনারশিপ সংলাপে উন্মুক্ত, স্বাধীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশন অর্জনে উভয় দেশ একসঙ্গে কাজ করতে একমত হয়েছিল। আসন্ন সংলাপে ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট করার তাগিদ আসতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, গত সংলাপে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আমরা এ বিষয়ে একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি। আসন্ন সংলাপে নিশ্চিতভাবে এটি উঠবে। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আলোচনা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই সুযোগ আছে। উল্লেখ্য, গত ছয় বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬৫০ কোটি (প্রায় সাড়ে ৭ কোটি ডলার) টাকার সামরিক অনুদান পেয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং এবং আন্তর্জাতিক মিলিটারি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। ওই টাকার একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরে মার্কিন যে উদ্যোগ রয়েছে সেটা শক্তিশালী করতেও বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে অতীতের সাতটি পার্টনারশিপ ডায়ালগে নেতৃত্বদানকারী সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক এ বিষয়ে বলেন, এটি দুই দেশের আনুষ্ঠানিক আলোচনার সর্বোচ্চ প্ল্যাটফরম। এখানে গুরুত্বপূর্ণ, বিতর্কিত, অ-বিতর্কিত- সব বিষয় নিয়েই খোলামেলা আলোচনা হয়। ২০১৯ সালের জুনে সর্বশেষ ৭ম পার্টনারশিপ ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়। এতেও এর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। সেই সব আলোচনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের পাশাপাশি নীতি প্রণয়ন করা হয়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে উভয় দেশের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, কিছু সহযোগিতার বিষয় থাকবে। আবার কিছু বিষয়কে দুই পক্ষ জাতীয় স্বার্থ, সংস্কৃতি অথবা অন্য কারণে ভিন্নভাবে পর্যালোচনা করে। এ ধরনের সবকিছু নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব আলোচনা করতে পারেন। আসন্ন সংলাপে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বাংলাদেশ কী চোখে দেখে সেটা সরাসরি বলার একটি সুযোগ তৈরি হবে বলেও মনে করেন সাবেক ওই রাষ্ট্রদূত।