বিবাহ বিচ্ছেদে ভাঙছে সমাজ

0

দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে তালাকের মাধ্যমে পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন গড়ে ৩৭টি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে। দিন দিন এ আবেদনের সংখ্যা বাড়ছে। গত তিন বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিচ্ছেদের বেশিরভাগ আবেদনই নারীদের পক্ষ থেকে হচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে বলেছেন, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন, ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা, উচ্চাভিলাসী মনোভাব বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ। এছাড়া পরকীয়ায় আসক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি বিচ্ছেদের কারণ হয়ে রয়েছে। পত্রিকা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যায় উল্লেখ্য করেছে।
সৃষ্টির শুরু থেকেই মহান আল্লাহ নারী ও পুরুষের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজবদ্ধ হয়ে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের নির্দেশ প্রদান করেছেন। পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে এ কথাও বলে দিয়েছেন, যৌক্তিক কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে। কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন পরিস্থিতিতে বিচ্ছেদ হতে পারে, তা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ এ কথাও ঘোষণা করেছেন, তালাক বা বিয়ে বিচ্ছেদ তাঁর সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ।
আমাদের পরিবার ও সমাজিক ব্যবস্থা এবং নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, পারস্পরিক বন্ধন, বিশ্বের অন্য সমাজ ব্যবস্থার চেয়ে একেবারে আলাদা। এখানে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের যে দৃঢ়তা, তা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে নেই বললেই চলে। সেখানে যেমন বিয়ে ছাড়াও অনেকে সংসার করে, তেমনি বিয়ে করেও সংসার করে। তবে বিবাহবর্হিভূত সংসারের হারই বেশি। এতে তাদের পারিবারিক প্রথা অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে অনেক সময় সেসব দেশের রাষ্ট্র প্রধানদেরও আক্ষেপ করতে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন দেশটির পারিবারিক প্রথা ভেঙ্গে যাওয়া এবং যুব সমাজের ব্যাপকহারে মাদকাসক্তি ও অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা এশিয়ান দেশগুলো থেকে শিক্ষা নেয়া উচিৎ। তার এ কথার অর্থ হচ্ছে, এশীয় দেশগুলো বিশেষ করে আমাদের দেশের যুথবদ্ধ পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা মানুষের সভ্যতাকে যেমন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তেমনি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলাও বজায় রাখছে। ঐতিহ্যগতভাবেই আমাদের দেশের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা বিশ্বে প্রশংসিত। বিদেশি রাষ্ট্র প্রধান থেকে শুরু করে পর্যটকরা সফরে এসে আমাদের দেশের মানুষের আথিথেয়তা ও আচার-ব্যবহারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং করছেন। আমাদের এই ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে। ভেতরে ভেতরে পরিবার ও সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে বিদ্বেষ বাড়ছে। পরিবারেও এ সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। যার অবসম্ভাবী পরিণতিতে তালাক বা সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার মতো নিকৃষ্টতম ঘটনা ঘটছে। কোরআন ও হাদিসে নারী-পুরুষের ন্যায্য অধিকারের কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ইসলামের এই অধিকারকে উপেক্ষা করার কারণেই পরিবারে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সময়ের সাথে মানুষের মন-মানসিকতা ও জীবনযাপনের প্রণালী পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। তবে নিজস্ব পরিবার ও সামাজিক ব্যবস্থার মৌলভিত্তি থেকে সরে গিয়ে বা উপেক্ষা করে হওয়া উচিৎ নয়। এক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার রক্ষা এবং তার নিয়মিত তাকিদ দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র পরিচালকদের। পরিতাপের বিষয়, এক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালকদের উদাসীনতা রয়েছে। তারা মনে করছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মানুষকে অর্থ রোজগারের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিতে পারলেই উন্নয়ন ঘটবে। এই নীতি যে বুমেরাং হয়ে উঠেছে, তা পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাওয়া বা বিশৃঙ্খল হয়ে উঠার মধ্য দিয়েই প্রতীয়মান হচ্ছে। তরুণ সমাজ যে, বিপথগামী হয়ে উঠছে এবং মানুষকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে ফেলার মতো রোমহর্ষক ঘটনা পরিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কারণেই ঘটছে। সরকার শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এসব প্রতিকারের দিকে বেশি মনোযোগী। কেন ও কি কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, সমাজে কি ঘটছে, তা খতিয়ে দেখছে না। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে যে পরিবার ও সমাজের ভেতরের পচন সারানো যায় না কিংবা যাবে না, তা আত্মহত্যা, তালাক বা নৃশংস ঘটনার আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হচ্ছে। তালাকের মাধ্যমে পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাওয়া বৃদ্ধি অত্যন্ত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে যে চিত্র উঠে এসেছে, বাস্তবতা তার চেয়েও ভয়াবহ। মানুষের নীতি-নৈতিকতা, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিরূপ প্রভাবে এ ভয়াবহতার জন্ম বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করবো মানুষ ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে জীবনধারায় ফিরে একটি সুন্দর সমাজ উপহার দেবে।