রোহিঙ্গা ইস্যুর মৃত্যু ঘটাতে চায় চীন?

মাসুম খলিলী
রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কট বাংলাদেশের জন্য অব্যাহতভাবে গলার কাঁটা হয়ে আছে। এই সঙ্কটের সৃষ্টি এবং এর সমাধানে ভূমিকা রাখার সুযোগ দু’টিতেই চীনের ভূমিকা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। কিন্তু চীন কি এ সঙ্কট নিরসনে আসলেই কোনো ভূমিকা রাখবে? এ প্রশ্ন ভূ-রাজনীতি বিশারদদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে। চীনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও ভূমিকায় মনে হচ্ছে বেইজিং রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানের আশ্বাস দিয়ে দিয়ে এটিকে একটি ডেড ইস্যু বানিয়ে ফেলতে চাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ইস্যুটি নিয়ে সময় ক্ষেপণ করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের সমাজ ও বাইরের দেশে আত্তীকরণ করে এ বিষয়টির স্থায়ীভাবে মৃত্যু ঘটাতে চাইছে বেইজিং। আর বাংলাদেশ চীনের উন্নয়ন সহায়তার ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যে এ নিয়ে বড় কোনো উচ্চবাচ্য করার সুযোগ সরকারের সামনে নেই। হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ালেও চীন রাশিয়ার মিয়ানমার সরকারকে সর্বাত্মক মদদ দান ও ভারতের নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় এই ইস্যুটির সমাধানে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। অধিকন্তু এমন কিছু তথ্য নানা সূত্র থেকে মিলছে যাতে মনে হতে পারে বাংলাদেশ বেইজিংয়ের একধরনের কৌশলগত ফাঁদে পড়েছে, যা থেকে বের হওয়া কঠিনই শুধু হবে না, একই সাথে বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস্থা দেখা দিতে পারে। র‌্যাব ও বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনীর কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় এই আশঙ্কা জোরদার হয়েছে।
ঢাকার কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা
স্বাধীনতা-উত্তর বছর চারেক সময় বাদ দেয়া হলে পররাষ্ট্র কৌশলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একধরনের ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করেছে। প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে চীনের সাথে সহযোগিতার একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কারো সাথে শত্রুতা তৈরি না করেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো এবং ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করেছে ঢাকা। এ ক্ষেত্রে ভারতের সাথেও একধরনের ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ যে পররাষ্ট্র কৌশল অনুসরণ করে তাতে চীনের সহযোগিতা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে প্রতিটি প্রচেষ্টায় বর্মি শাসকদের প্রতি চীনের নীরব সমর্থন থাকলেও এ ব্যাপারে ঢাকা কোনো সময় আপস করেনি। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট থাকাকালে প্রথম রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়। সে সময় এবং এর পরে বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকারের সময় এ বিষয়টি ডিল করেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য কর্নেল (অব:) অলি আহমদ। তিনি গণমাধ্যমকে সম্প্রতি এ ব্যাপারে জানান, সে সময় মিয়ানমারের সামরিক সরকার যখন কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সাড়া দিচ্ছিল না তখন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়া হলে আরাকান বার্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর বর্মি সরকারের কানে পানি যায় এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়। বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের সময় বেইজিং তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিপুল অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহায়তার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আত্তীকরণ করার প্রস্তাব দেয়। বেগম জিয়ার একজন উপদেষ্টা তখন এই প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে জানান, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। চীনের সাথে বিএনপি সরকারের সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টির জন্য তাইওয়ান ইস্যুকে মূল কারণ হিসেবে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের তথ্য অনুসারে রোহিঙ্গাদের গ্রহণের ব্যাপারে চীনা অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করাকে বেইজিং স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি এবং এতে ক্ষুব্ধ হয় চীনা নেতৃত্ব। পরবর্তী সরকারের সময় বিশেষত বাংলাদেশে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরবর্তী সরকারের সময় রোহিঙ্গাদের ঢল নামে বাংলাদেশমুখী। বাংলাদেশের সরকার এ সময় মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দেয় বলে উল্লেখ করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উদারভাবে প্রশংসা করে। কিন্তু কিছু ভূ-রাজনীতির কৌশলবিদ ঢাকার নতুন নীতিকে দূরদর্শী হিসেবে মানতে পারেনি। তাদের মতে, মানবিকতার আড়ালে এর মাধ্যমে রাখাইন অঞ্চলকে রোহিঙ্গামুক্ত করার সুযোগ দেয়া হয়েছে মিয়ানমারকে।
বাংলাদেশে ২০১৪ সালের জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে সরকার প্রতিবেশী দেশের আনুকূল্য লাভ করেছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়; কিন্তু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে গ্রহণ করার পর ২০১৮ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে সরকার তার মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রধান সমর্থন চীন থেকে লাভ করে। এর আগে ২০১৬ সালে চীনা নেতা শি জিন পিং বাংলাদেশ সফরে আসেন। এ সময় চীনা প্রেসিডেন্ট ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশকে। চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের পর তিনটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে বড় আকারের চীনা বিনিয়োগ আসতে থাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব বিরোধী দলের অংশগ্রহণের পর হাতেগোনা কয়েকটি আসন ছাড়া রাতের ভোট হিসেবে খ্যাত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আরেকবার সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের পর প্রথম স্বর্ণের নৌকা নিয়ে অভিনন্দন জানান ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। এরপর চীনা দূতাবাসের অনুষ্ঠানগুলোতে শাসক দলের রাজনৈতিক স্লোগান ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিত হতে থাকে। রাষ্ট্রের চেয়ে দলের সাথে সম্পর্ক পাতানোকে চীনা পররাষ্ট্র কৌশলে প্রাধান্য পেতে দেখা যায়। চীনের সাথে এই বিশেষ ঘনিষ্ঠতা এবং ভোটারবিহীন নির্বাচন আর সে সাথে গুম খুনের মতো মানবাধিকার পরিপন্থী কাজে পশ্চিমের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে ঢাকার। সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার কিছু কর্মসূচি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঢাকার সম্পর্কে বড় রকমের অচলায়তন তৈরি হয়। জো বাইডেন আমেরিকান প্রশাসনের দায়িত্ব নেয়ার পর বছরাধিক সময়ে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে এর প্রকাশ ঘটে।
চীনের কৌশলে পরিবর্তন?
চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর থেকে মাও সেতুংয়ের সময় এক ধরনের পররাষ্ট্র কৌশল দেখা যায়। এই কৌশলে কমিউনিজমের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের মধ্যেও। মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর সেই ধারা আর থাকেনি। বিশেষত দেং শিয়াও পিং চীনের নেতৃত্বে আসার পর দেশটি তার অর্থনৈতিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। রাজনৈতিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টির শাসন বহাল থাকলেও বাজার অর্থনীতি গ্রহণ এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে চীনকে তিনি সমন্বয় করেন। আদর্শ বা বিপ্লব রফতানির বিষয় স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর চীনা নীতিতে আর দেখা যায়নি। দেং শিয়াও পিংয়ের পরও পরবর্তী নেতারা চীনকে সেই পথেই নিয়ে যান। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য থাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিয়েই রাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধি করা। বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ব্যাপারে চলা এই ধারার অবসান ঘটে বর্তমান নেতা শি জিন পিং প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর। শি অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিও গুরুত্ব দেন। দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তারের এই প্রচেষ্টায় ভারতের সাথে প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় চীনের। দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানকে একীভূত করার নানান নেপথ্য উদ্যোগ নিয়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত তৈরি হয়। এই সঙ্ঘাতে চীন তার ঐতিহ্যগত জ্বালানি রুট মালাক্কার ওপর নির্ভর করার ঝুঁকি হিসাব করে বিকল্প রাস্তা খুঁজতে থাকেন। এর অংশ হিসেবে একটি রুট ঠিক করা গোয়াদর বন্দর থেকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর হয়ে জিংজিয়াং পর্যন্ত। অন্য একটি জ্বালানি রুট তৈরির চেষ্টা নেয়া হয় আরাকানের কিউক ফিউ বন্দর থেকে রাখাইনের ওপর দিয়ে কুনমিং পর্যন্ত। শেষের জ্বালানি রুটকে ঘিরে চীন একটি অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির পরিকল্পনা নেয়। এই রুটটিকে দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ করার জন্য চীনা কৌশলবিদরা রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাধা মনে করে। আর মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বের রোহিঙ্গামুক্ত রাখাইন পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে পরবর্তী কৌশলগত দাবার গুটি সাজানো হয়। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পর এ সংক্রান্ত চীনের প্রতিটি পদক্ষেপকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দু’টি বিষয় বের হয়ে আসবে। প্রথমত রোহিঙ্গারা যাতে আর কোনো সময় রাখাইনে ফিরতে না পারে তার আয়োজন করা। দ্বিতীয়ত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ী অভিবাসন বা আত্তীকরণের ব্যবস্থা করা। একই সাথে মুসলিম দেশ বা অন্য কোনো স্থানে তাদের পুনর্বাসনের জন্য চেষ্টা করা। তৃতীয়ত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যথাসম্ভব মিয়ানমারের সীমান্ত থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যাওয়া। তবে কোনোভাবে পার্বত্য জেলাগুলোতে তাদের পুনর্বাসন না করা।
বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের শাসনের সময় প্রথম দফা যখন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয় তখন রোহিঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলন গঠন এবং আরাকানকে স্বাধীন করার প্রচেষ্টার হুমকির মুখে বর্মি শাসকরা তাদের ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের সীমান্ত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া সম্ভব হলে সেই ধরনের কোনো প্রতিরোধ আন্দোলন গড়া সম্ভব হবে না বলে বর্মি-চৈনিক কৌশলবিদরা মনে করেন। ধারণা করা হয়, নোয়াখালীর দূরবর্তী দ্বীপ ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের পেছনে এই চিন্তাভাবনার যোগসূত্র থাকতে পারে। এখন ভাসানচরের বাইরে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের জন্য আরো দ্বীপের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ভাসানচর দ্বীপে পুনর্বাসনের ব্যয় কোত্থেকে সংস্থান করা হচ্ছে তার পুরো তথ্য জানা যায়নি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, এর খরচ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেইজিং বহন করছে। রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে না চাইলেও তাদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া চীনা চাপের কারণেই হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসঙ্ঘ ও দাতা দেশগুলো যে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে তারা ভাসানচর পরিকল্পনাকে প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করেনি। পরে ভাসানচরে কাজ করতে রাজি হলেও পশ্চিমারা এই উদ্যোগের পেছনে চীনের কৌশলগত মতলব খুঁজে পাচ্ছেন। ফলে তাদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মিয়ানমারকে সজ্জিতকরণ
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে চীনের সবচেয়ে আস্থাভাজন মিত্র হিসেবে পরিচিত মিয়ানমার। ষাটের দশকে বার্মায় জান্তা শাসন প্রতিষ্ঠায় চীনা সহায়তা ছিল। পাশ্চাত্যের চাপের মুখে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সাময়িকভাবে মেনে নিলেও আবার সামরিক জান্তার শাসনকে বেইজিং বেশি পছন্দ করেছে। চীনা নীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বেইজিং সব সময় কর্তৃত্বমূলক শাসকদের সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এ ধরনের শাসনে দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় এবং জবাবদিহিতা ও প্রতিযোগিতামূলক বিষয় অর্থনৈতিক চুক্তির ক্ষেত্রে থাকে না। চীনারা যেভাবে কর্তৃত্বমূলক শাসনে বেশি স্বস্তি অনুভব করে তেমনিভাবে কর্তৃত্বমূলক সরকারগুলোও চীনের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে অধিক আগ্রহ অনুভব করে। বাংলাদেশে যারা ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বা জবাবদিহিতার বাইরে গিয়ে অব্যাহত রাখতে চান তারা চীনা আনুকূল্য লাভ করেন। বাংলাদেশে শি জিন পিংয়ের আমলে এসে ঢাকা-বেইজিং বিশেষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই হিসাব নিকাশ কাজ করেছে বলে মনে হয়। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুর জাতীয় নিরাপত্তার একটি দিক থাকায় রাজনৈতিক সরকার সব সময় এই বিষয়টি স্বাধীনভাবে ডিল করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবাহিনীর নিজস্ব একটি ডকট্রিন সামনে চলে আসে। এই ডকট্রিনের কারণে বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনীর সমরাস্ত্র সংগ্রহে সম্প্রতি চীনের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে অন্য দেশ থেকেও সমরাস্ত্র আমদানি করা হচ্ছে। বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে মিয়ানমারের পক্ষে প্রকাশ্যভাবে থাকছে চীন ও রাশিয়া। ভারত নীরবে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখছে। বাংলাদেশে চীন যখন দু’টি মাঝারিমানের সাবমেরিন বিক্রি করে তখন ভারত মিয়ানমারকে একটি কিলো ক্লাস সাবমেরিন দেয়। চীন অতি সম্প্রতি আরো একটি সাবমেরিন দিয়েছে মিয়ানমারকে। এর বাইরে চীন উত্তর কোরিয়া থেকে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে মিয়ানমারের জন্য। রাশিয়া ও ইসরাইল থেকেও সমরাস্ত্র সংগ্রহ করেছে মিয়ানমার। মিয়ানমারকে এভাবে সমরসজ্জিত করার ফলে চাপে পড়ছে বাংলাদেশ। আর এই ক্ষেত্রে প্রকাশ্য ও গোপনে মিয়ানমারকে বেইজিং ইন্ধন দিলেও ঢাকা নীরবই থাকছে।
কৌশলগত দ্বন্দ্ব মোকাবেলা
রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে চীনা ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণে দেশ হিসেবে একটি বড় মূল্যের বিষয় আছে বাংলাদেশের। ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে অভিবাসন দেয়ার অবস্থায় বাংলাদেশ আছে বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে এই ইস্যুর আদর্শ সমাধান হলো তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো ব্যবস্থা করা। আর এ জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামের সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। এই সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র এবং মুসলিম দেশগুলো দিয়ে এসেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকার বলয়ে অনেক কর্তৃত্বমূলক দেশ থাকলেও এক মেরুর বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে তাদের সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে বেশি মূল্য দিয়েছে। আরব জাগরণের ঘটনাগুলো তারই ধারাবাহিকতায় ঘটেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। মাঝখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের শাসনকে তা থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হয়। এখন নতুন করে আমেরিকান নীতিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিষয়গুলো ফিরে এসেছে। এর জের ধরে র‌্যাব ও কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা আরো সামনে এগোলে সার্বিকভাবে চাপের মুখে পড়বে দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। মিয়ানমার বাংলাদেশের ওপর আক্রমণ করে বসলে অথবা আরাকান আর্মির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমরসজ্জিত করার যেসব খবর প্রকাশ হচ্ছে তাতে দেশ একধরনের অরক্ষিত হওয়ার অবস্থা দেখা দেবে। এই অবস্থায় রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

ভাগ