কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিচ্ছে না অনেকেই

0

অপ্রদর্শিত অর্থ মানেই অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ নয়। অনেকের বৈধ উপার্জন, জমি-জায়গা ইত্যাদি বিক্রির অর্থ সতর্কতার অভাব, ভুল-ত্রুটি ইত্যাদির কারণে অপ্রদর্শিত অর্থভুক্ত হয়ে যায়। তাদের ক্ষেত্রে অর্থ প্রদর্শন না করাটা আইনের চোখে অন্যায় বটে। পক্ষান্তরে ঘুষ, কমিশন, চাঁদা, বখরা এবং অন্যান্য অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ সরাসরিই অবৈধ অর্থ। এই দু’ধরনের অর্থই অপ্রদর্শিত অর্থ হিসেবে গণ্য। অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার ক্ষেত্রে তাই বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ যাতে প্রদর্শিত হয় এবং দেশেই তার বিনিয়োগ হয়, সেজন্য চলতি জাতীয় বাজেটে ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ব্যাপক আশা ছড়িয়ে বলা হয়েছিল, অপ্রদর্শিত অর্থ নির্ধারিত কর ও জরিমানায় বৈধ করা যাবে। এ নিয়ে তখন বিভিন্ন মহল বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু বিদেশে অর্থ পাচার রোধ ও দেশেই তা বিনিয়োগের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বলে অর্থমন্ত্রী বাজেট পাস করান। এটা করা হয়েছিল। যেহেতু এ অর্থ অলস পড়ে থাকে এবং পাচারের আশংকাও থাকে সেহেতু তা বৈধতা দিয়ে বিনিয়োগে আনা গেলে শিল্প, পুঁজিবাজার, গৃহায়ণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে গতি আসবে, কর্মসংস্থানসহ নানা উপকার মানুষ লাভ করবে বলে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছিলেন। এই লক্ষ্য প্রত্যাশা মতো অর্জিত হচ্ছে না বলে একটি শীর্ষ দৈনিকে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১২২ জন মাত্র ১৫ কোটি টাকা বৈধ করেছেন। দেশে যে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ আছে বলে মনে করা হয়, তার তুলনায় ১৫ কোটি টাকা কিছুই নয়। টিআইবি’র এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জিডিপির ১০ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে অপ্রদর্শিত অর্থ ওঠানামা করে। এ থেকে কী পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ দেশে রয়েছে, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বিদেশে অর্থ পাচারের যে তথ্যাদি পাওয়া যায়, তা থেকেও এটা বুঝা যায়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্রাংক, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইনাসিয়াল ইন্টিগ্রেটি (জিএফআই) জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত (২০১৪ সাল বাদ) ৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার, অধিকাংশ ব্যাংক গ্রাহকস্বার্থে তথ্য দেয় না। ফলে, পাচারের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায়, তা আংশিক মাত্র।
বিদেশে অর্থ পাচার দেশের জন্য, দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। পাচার হওয়া অর্থ দেশেই বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগ হলে সেক্টরগুলো যেমন সমৃদ্ধ হতো, তেমনি দেশের অর্থনীতিও ঋদ্ধ হতো। মানুষের আয় বাড়তো, জীবনমানের উন্নতি হতো। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়- অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে নেয়া প্রয়াস ঠিকমত ফলপ্রসূ না হওয়ার কারণ নানাবিধ। এক্ষেত্রে প্রায় ২৭ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হয়। ৬ শতাংশ জরিমানাসহ কর পরিশোধে অনেকেই আগ্রহী হয় না। এক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন, কর-জরিমানা আরো কম হলে অর্থ বৈধ করার আগ্রহ ও অর্থের পরিমাণ অনেক বাড়তো। কালো টাকা সাদা করার বিদ্যমান আইন যদি বহাল রাখা হয় তাহলে সবাই যাতে দেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হয় সে পথ সুগম করতে হবে।  নীতি, পরিবেশ ও বাস্তবতার প্রতিকূল্যে দেশ থেকে প্রায় অবাধে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। যারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করছে, ধরা পড়া কিংবা জবাবদিহির ভয়ে সেই অর্থ সরিয়ে ফেলা ছাড়া তাদের উপায় নেই। তাদের অর্থ বেশিরভাগই পাচার হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। পাচারকারীদের মধ্যে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। অনেক নির্ভার-নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় জমি-সম্পত্তি বিক্রি করেও অনেকে সেই অর্থ পাচার করছে। পাচার করা অর্থ কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে স্থিত হয়েছে। ওইসব দেশে বাড়িঘর ক্রয় ছাড়াও শিল্প-ব্যবসায়ে বিনিয়োগ হচ্ছে। বাংলাদেশিদের বিদেশে বিনিয়োগে কোনো বাধা নেই। অনেক ব্যবসায়ী বৈধ পথে বিদেশে বিনিয়োগ করছে। তবে বৈধভাবে বিদেশে অর্থ নিয়ে যাওয়ার বিধিব্যবস্থা সহজ নয়। সে কারণে অবৈধ পন্থাই অনুসৃত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, পাচার হওয়া অর্থে যেখানে বিদেশে বিনিয়োগ হচ্ছে, সেখানে দেশেই সে অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে না কেন? নীতি সহায়তার অভাব, দুদক-এনবিআর প্রভৃতি সংস্থার খবরদারি, বিনিয়োগপরিবেশের অভাব, নিরাপত্তার সংকট, সুশাসনের ঘাটতি ইত্যাদি এজন্য প্রধানত দায়ী। একটি শ্রেণি টাকা-পয়সা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে নিরাপদ জীবনের আশায়। তারা দেশকে বাসযোগ্য মনে করছে না। অন্যদের প্রধান লক্ষ্য বিদেশে স্থায়ী হওয়া। এমতাবস্থায়, আমরা যদি অর্থপাচার বন্ধ করতে চাই তাহলে দেশকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করতে হবে। দেশের অর্থ দেশেই যাতে মানুষ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় তার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।