মালয়েশিয়ায় সফল নারী উদ্যোক্তা ঢাকার সানা

আশরাফুল মামুন, মালয়েশিয়া থেকে॥ দক্ষিণ এশিয়ার ইউরোপখ্যাত মালয়েশিয়ায় এখন বাংলাদেশিদের জন্য অপার সম্ভাবনার শ্রম ও ব্যবসার বৃহত্তর বাজার। পাশাপাশি সব ধরনের ব্যবসার আদর্শ স্থান কুয়ালালামপুর। মালয়েশিয়া বলতে বুঝায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী ও নিয়োগকর্তাদের কর্মসংস্থানের নির্ভরযোগ্য মিলনমেলা। শ্রম বিক্রির বৃহত্তর বাজার হলেও এখানে ব্যবসার রয়েছে নিরাপদ উর্বরক্ষেত্র। ব্যবসা করে রাতারাতি বিলিয়নিয়ার সংখ্যাও কম নয়। সব সুযোগ-সুবিধা থাকে যেখানে সেখানে অসুবিধা ও প্রতিবন্ধকতাও থাকে। আর সব প্রতিকূলতাকে জয় করে বাংলাদেশের পুরান ঢাকার মেয়ে সানা বিনতে রহমান সফলতার সঙ্গে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন স্বপ্নপুরী মালয়েশিয়াতে। পুরুষ শাসিত সমাজের সব প্রতিবন্ধকতাকে উড়িয়ে দিয়ে নারীদের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের তৈরিকৃত ভেষজ উপাদান দ্বারা প্রস্তুতকৃত স্কিনকেয়ার সামগ্রী নিয়ে কাজ করে মালয়েশিয়ানদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছেন এই বাঙালি নারী।
সানা বিউটি ইমপ্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান ত্বকের যত্নের জন্য নিজের তৈরি ভেষজ গুণসমৃদ্ধ প্রোডাক্ট সফলতা এনে দিয়েছে সানার জীবনে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সানা বিনতে রহমান। জন্মস্থান রাজধানীর পুরান ঢাকায়। শৈশব-কৈশোর পরিবারের সঙ্গে ঢাকাতেই কেটেছে তার। ২০০৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিক্রমপুরের মালয়েশিয়া প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এসএম নিপুর সঙ্গে। বিয়ের পর প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান এই উদ্যোক্তা এবং সফল ব্যবসায়ী।
মালয়েশিয়াতে সানা বিনতে রহমান ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি অব মালয়েশিয়া (ইউটিএম) থেকে ২০১১ সালে ফ্যাশন বিএসসি ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের ওপর তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা শেষ করেন। এরপর ২০১৪ সালে বোটানিক্যাল অর্গানিক স্কিন কেয়ার কনসালটেন্সির ওপর দুই বছর মেয়াদি আরও একটি ডিপ্লোমা সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। সানা বিনতে রহমান বিয়ের পর ২০০৬ সাল থেকে ব্যবসায়ী স্বামী নিপুর সঙ্গে প্রায় ১৫ বছর যাবৎ মালয়েশিয়াতে অবস্থান করছেন। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর শহরে সানা-নিপু দম্পতির বর্তমান নিবাস।
স্বামী এবং তিন সন্তান নিয়ে পরিবারের পাশাপাশি সানা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। বোটানিক্যাল অর্গানিক স্কিন কেয়ার কনসালটেন্সির ওপর নিজের করা ডিপ্লোমা কাজে লাগিয়ে কাজ করছেন ভেষজ উপাদানে তৈরি স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট নিয়ে। সানার তৈরি প্রোডাক্টের গুণগত মানের কারণে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ে এসেছে ব্যাপক সফলতা। সানা বিউটির প্রোডাক্ট মালয়েশিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশও বাজারজাত করা হচ্ছে। সানার এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিয়ে প্রবাসের নানা জটিলতাকে চ্যালেঞ্জ করে যেভাবে সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছেছেন এই সফলতা দেশের মধ্যে এবং মালয়েশিয়া প্রবাসীদের কাছে সানা বিনতে অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে বিগত ৪ বছর ধরে ভেষজ উপাদান দিয়ে নিজেই তৈরি করছেন ত্বকের জন্য বিভিন্ন সামগ্রী। তার তৈরি করা সামগ্রীগুলো হলো উপাটান, বডি স্ক্যাব, বডি মাস্ক, হেয়ার পেক, টনিক, ক্রিম, সিরাম ও নানা ধরনের স্কিন প্রোডাক্ট।
সানা বিউটি সম্পর্কে জানতে চাইলে সানা বিনতে রহমান বলেন, ‘আমি নিজেই বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে এই স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টগুলো তৈরি করে থাকি। এগুলো আমাদের ত্বকের জন্য অনেক উপকারী। আমার তৈরি স্কিনের প্রোডাক্টগুলো ইতিমধ্যেই মালয়েশিয়াতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসে। এ ছাড়াও আমি আমার ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনেককেই স্কিন অ্যাডভাইস দিয়ে থাকি। আমি চাই, আমার প্রোডাক্টগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিতে, আমি এখন সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে সানার স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টগুলো ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি তার প্রস্তুতকৃত সামগ্রী ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছেন। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন শহর থেকে প্রোডাক্ট অর্ডার পেয়ে থাকেন সানা। প্রোডাক্ট বিক্রির পাশাপাশি সানা তার ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ত্বকের যত্নের পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিনামূল্যে। যারা মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করতে চান বা দেশটিতে বিনিয়োগ করতে চান তাদের জন্য দেশটির সরকার নানা রকম প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইতিমধ্যে ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম ভিসায়’ ব্যাপক পরিবর্তন এনে দেশটিতে স্থায়ীভাবে ব্যবসা ও বসবাস করার জন্য শর্ত শিথিল করে নানা সুবিধা দিচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে মারাত্মকভাবে ধস নেমেছে। তাই এই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার মরিয়া হয়ে সব সেক্টরে বিদেশি নিয়োগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে চূড়ান্তভাবে সম্মত হয়েছে।

ভাগ