খুলনা ব্যুরো॥ খুলনা জেলা পরিষদের দু’টি ঘাট ইজারা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আহবানকৃত দরপত্র নানা অজুহাতে বারবার স্থগিত করে স্বল্পমূল্যে ঘাট দু’টি খাস আদায়ে প্রদান করা হয়েছে। এতে করে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ ঘাট দু’টি থেকে প্রতি বছর ২২ লাখ ২০ হাজার টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদিকে, ঘাট দু’টি ইজারা প্রদানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে এর প্রতিকার দাবি করেছেন মো. শহীদুল ইসলামসহ কয়েকজন ইজারা প্রত্যাশি। এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগও দাখিল করা হয়েছে। তবে, জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ লিখিত অভিযোগ সরাসরি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে- এ অভিযোগ এনে শহীদুল ইসলাম রেজিস্ট্রি ডাকযোগে অভিযোগের কপি প্রেরণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ঘাট দু’টির বিপরীতে দরপত্রের শর্ত মেনে বছরে ৪৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েই ইজারা গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। যা বর্তমানে বছরে মাত্র ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা খাস আদায়ে প্রদান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা জেলা পরিষদের পরিচালনাধীন দিঘলিয়া উপজেলার বারাকপুর সন্ন্যাসীর বাজার হাট (বারাকপুর খেয়া ঘাট) ও দৌলতপুর বাজার ঘাট ইজারা প্রদানের লক্ষে প্রথম দফায় আহবানকৃত দরপত্রের সিডিউল ক্রয়ের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয় গত ৩০ মার্চ। যার দরপত্র জমাদানের শেষদিন ছিল ৩১ মার্চ। কিন্তু কোন ধরণের ব্যাখ্যা ছাড়াই স্বেচ্ছাচারিভাবে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে ওই দরপত্র স্থগিত করেন জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে এক সপ্তাহ পর দ্বিতীয় দফায় ৫ এপ্রিল ক্রয় এবং ৬ এপ্রিল জমাদানের শেষ দিন ছিল। কিন্তু করোনা মহামারিতে ‘লকডাউন’র অজুহাতে সেটিও স্থগিত করা হয়। সর্বশেষ এক সপ্তাহ পর পূণরায় তৃতীয় দফায় দরপত্র আহবান করে ১১ এপ্রিল ক্রয় এবং ১২ এপ্রিল জমা দেওয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়। সে অনুযায়ী দরপত্র গ্রহণে আগ্রহী ঠিকাদাররা যথারীতি দরপত্র জমাও প্রদান করেন। কিন্তু আগে থেকে কোন কিছু না জানিয়েই জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত নোটিশ টানিয়ে এবারও স্থগিত করা হয়। তবে, তৃতীয় দফায় কারণ হিসেবে উল্লিখিত ঘাট নিয়ে সিনিয়র সহকারী জজ আদালত দৌলতপুরে (দেঃ ৬৪/২০২১ ও দেঃ ৭০/২১) দু’টি মামলা বিচারাধীন থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। যে কারণে জমা দেওয়া দরপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন ইজারা প্রত্যাশিরা। এদিকে, মামলার কারণে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ ঘাট দু’টির দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিত রাখেন। কিন্তু পরবর্তীতে কৌশল হিসেবে অফিসিয়ালি ঘাট পরিচালনার লক্ষে জেলা পরিষদেরই প্রধান সহকারী মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের নামে প্রতি মাসে মাত্র ৮০ হাজার টাকা খাস আদায় দেখিয়ে দৌলতপুর বাজার ঘাটটি প্রদান করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দৌলতপুর বাজার ঘাটটি অফিসিয়ালি পরিচালনার নামে রাখা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটি মামলার বাদিপক্ষকেই প্রদান করা হয়েছে। তারাই ঘাটটি পরিচালনা করছেন। কারণ হিসেবে বাদিপক্ষ আগেই মামলায় উল্লেখ করেছেন, জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে অগ্রীম অর্থ গ্রহণ করেছেন। যা নিয়মের বাইরে। প্রতি মাসের রাজস্ব প্রতি মাসেই গ্রহণের নিয়ম থাকলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কয়েক মাসের অর্থ একসঙ্গে নেয়া হয়েছে বলেও একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে। ইজারা প্রত্যাশি ঠিকাদার মো. শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, উল্লিখিত ঘাট দু’টির বিষয়ে দু’ দফায় দরপত্র দাখিল ও মূল্যায়ন স্থগিত করা হয়। তৃতীয় দফায়ও তিনি সিডিউল জমা দেন। কিন্তু মামলার কথা বলে পুনরায় স্থগিত করেন জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। তবে, আদালত কর্তৃক স্থগিতের কোন আদেশ ছিল না। এখন খাস আদায়ের নামে স্বল্পমূল্যে ঘাট দু’টি বিভিন্ন ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছে। যাতে করে কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি দ্রুত ঘাট দু’টি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ইজারা প্রদানের দাবি করেন। অপর ইজারা প্রত্যাশি ঠিকাদার মো. সাকিব খানের অভিযোগ, প্রতিবারই সিডিউল জমা দিতে গিয়ে দাখিল ও মূল্যায়ন স্থগিত করা হয়েছে- মর্মে নোটিশ দেখতে পাই। কিন্তু বিষয়টি আগে থেকে তাদের জানানো হয়নি। তারপরও তিনি খাস আদায়ে অধিক মূল্যে নিতে চাইলেও তাকে দেয়া হয়নি। শুধু মূল্য বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মাসে মাত্র ৮০ হাজার টাকায় জেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রিয় লোকদের দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে- দাবি করে তিনি ঘাটগুলোর টেন্ডার আহবানের দাবি জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, ঘাটের ইজারা বা খাসের ক্ষেত্রে কাগজপত্রে কম মূল্য লিখিত থাকলেও গোপন চুক্তির মাধ্যমে তার কয়েকগুণ বেশি অর্থ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়। জেলা পরিষদের একজন কর্মকর্তা তার অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে সরাসরি ঠিকাদারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। দামের দেন-দরবারে যে তার চাহিদা পূরণ করতে পারেন- তিনিই কেবল ইজারা প্রাপ্ত হন। আর এ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠান বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও ওই কর্মকর্তার পকেট ভারি হয়। এভাবে অল্প দিনেই তিনি প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। খুলনা জেলা পরিষদের পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, মামলার কারণে আদালত থেকে তাদের শোকজ করা হয়। এ কারণেই টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আদালতে শোকজের জবাব দাখিল করা হয়েছে। এখন আদালতের পরবর্তী আদেশের পরই ঘাট দু’টি রি-টেন্ডার আহবান করা হবে। এ কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া ঠিকাদারদের লিখিত অভিযোগের বিষয়ে অফিসের নিয়ম অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।





