লোকসমাজ ডেস্ক॥ রোহিঙ্গা সঙ্কটের চার বছরপূর্তিতে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে যেকোনো তৎপরতা বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবার সকাল থেকেই কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বাংলাদেশের (এপিবিএন) সদস্য ছাড়াও জেলা পুলিশের সদস্য, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তৎপর রয়েছে। ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সঙ্কটের চার বছর পূর্ণ হলো। তবে বছরপূর্তির দিনে সভা-সমাবেশ করতে না পারলেও নিজ দেশে ফেরতে পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি রোহিঙ্গাদের।
২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যার মুখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারে সাড়ে সাত লাখের অধিক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। এর ঠিক দুই বছরের মাথায় ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সমাবেশের ঘটনায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর সরকার ক্যাম্পে যে কোনো ধরনের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত জানিয়েছেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিসহ নিরাপত্তা জনিত কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সভা-সমাবেশের কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শান্ত রয়েছে। তবে ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সঙ্কটের চার বছরপূর্তির দিন ফজরের নামাজের পর মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিল হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় বিভিন্ন লেখা সম্বলিত প্লে-কার্ড নিয়ে রোহিঙ্গা শিশুরা বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট সংক্ষিপ্ত মানববন্ধন করেছে। তবে পুরো রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই এপিবিএন সদস্য পুলিশের টহল জোরদার করা হয়। ফলে বড় কোনো সভা-সমাবেশ হয়নি।
এদিকে জাতিগত সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের চার বছর পূর্ণ হলেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নেই কোনো অগ্রগতি। রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরতে পূর্ণ নাগরিক অধিকার, নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তাসহ রোহিঙ্গারা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া জানিয়েছেন। বুধবার সকালে কুতুপালং ১৭ নম্বর ক্যাম্পে সরেজমিনে দেখা যায়, দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন মিয়ানমারের ঢেকুবনিয়ার কয়েক বাসিন্দা। তারা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে প্রাণভয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেয় উখিয়ার এই ক্যাম্পে। এখন তাদের চোখে মুখে আর ভয় নেই। সেই আতঙ্ক কেটে গেছে। তাদের মুখে ফিরেছে হাসি। রোহিঙ্গাদের দাবি, দেশে ফিরতে মিয়ানমারকে পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
অপর দিকে স্থানীয়দের মতে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে ধ্বংস হয়েছে বাংলাদেশের হাজার হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি। নষ্ট হয়েছে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীসহ জীববৈচিত্র্যের। যতই দিন যাচ্ছে মাদক কারবার, মানবপাচার, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, খুন ও অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশে স্থায়ী হওয়ার। এতে স্থানীয়রা বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে দাবি জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের। কক্সবাজারের উখিয়া রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, বিভিন্ন জায়গায় তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা, বাণিজ্য, গাড়ি চালানোসহ বিভিন্নকাজে তারা জড়িয়ে পড়ছে। কক্সবাজার পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, তারা টাকার বিনিময়ে খুন করছে, মাদকপাচারে জড়িয়ে যাচ্ছে। এ দিকে রোহিঙ্গা সঙ্কটের চার বছরপূর্তির দিন বুধবার সকালে কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দাবিতে মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে কক্সবাজারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে নানা সঙ্ঘাত দেখা দিয়েছে। মাদক কারবার, হত্যা অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে তাদেরকে এক জায়গায় নিয়ে আসা দরকার। যারা অবৈধভাবে পাসপোর্ট ও এনআইডি করেছে সবগুলো বাতিল করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মদতদাতা চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সমাবেশে দাবি জানান বক্তারা।





