খুলনায় মাত্র তিন ঘন্টায় ফুরিয়ে যায় গণটিকা কেন্দ্রে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলার অভিযোগ

মো. জামাল হোসেন,খুলনা ॥ খুলনা মহানগরী ও জেলার কেন্দ্রগুলোতে গণটিকা প্রদান ফুরিয়ে যায় মাত্র তিন ঘন্টায়। শনিবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় টিকা। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও দীর্ঘ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করেও টিকা না পেয়ে অনেককেই বাড়িতে ফিরতে হয়েছে। অপরদিকে, টিকা কেন্দ্রগুলোতে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। ছিল না কোনো স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বালাই। সামাজিক দূরত্বেরও কোনো ছিটেফোঁটা চিত্র চোখে পড়েনি। এ কারণে অনেক কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
শনিবার সকাল থেকে নগরীর আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। হালকা বৃষ্টির মধ্যে করোনা নির্মূলের মানসিকতা নিয়ে স্বামী-স্ত্রী, মা-মেয়ে দল বেধে কেন্দ্রে হাজির হন। কোথাও কোথাও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বেলা ১২ টার মধ্যে খবর আসে টিকা ফুরিয়ে গেছে। কেন্দ্রে এসে বিফল মনোরথে ফিরতে হয় অধিকাংশকে। বৃহস্পতিবার নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে কেসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে মাইকিং করে বলা হয়, শনিবার থেকে শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা দেওয়া হবে। নগর স্বাস্থ্য ভবনে সকাল ৯টা থেকে দীর্ঘ লাইন পড়ে। টিকা প্রত্যাশীদের হইচই। পুলিশ বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে পারছে না। লাইনে অপেক্ষার সংখ্যা প্রায় ২শ। টিকা না পেয়ে নগরভবন থেকে বাড়ি ফিরেছেন হাওয়া বেগম, নাজমা খাতুন, রাশিদা বেগম, নাসরিন খাতুন ও তাদের কর্তারা।
২৩ নং ওয়ার্ডের অধিবাসী প্রশান্ত বিশ্বাসের স্ত্রী শর্মী বিশ্বাস, শিবপদ বিশ্বাসের স্ত্রী সাধনা বিশ্বাস, শেখ মুনসুর রহমানের স্ত্রী সোনালী পারভীন, নিখিল সরকারের স্ত্রী কৃষ্ণা রানী সরকার, প্রশান্ত সরকারের পুত্র উত্তম সরকারসহ শতাধিক মানুষ সকাল ৯টা থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন গোলকমনি শিশুপার্ক কেন্দ্রে। এ কেন্দ্রে ২শ নারী পুরুষকে টিকা দেওয়ার পর বেলা ১২ টা নাগাদ খবর আসে টিকা শেষ। সবুরননেছা কেন্দ্রে ১২টার মধ্যে ২শ নারী পুরুষ টিকা গ্রহণ করেন। অপেক্ষমান ছিলেন আরও ৫০ নারী-পুরুষ। তবে স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের ফিরিয়ে দেন। খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে ২শ নারী-পুরুষ টিকা নিয়েছেন। বেলা পৌনে ১টা নাগাদ কর্মসূচি শেষ হয়। বাবু খান রোড, হাজী মহসীন রোড ও খানজাহান আলী রোডের শতাধিক মানুষ এ কেন্দ্র থেকে ফিরে যান। এদিকে, মিউনিসিপ্যালিটি ট্যাংক রোডের ২৯ নং ওয়ার্ড থেকে একই ওয়ার্ডের মিন্টু সরদার ও হাফিজুল হক টিকা পেয়ে খুব খুশি হন। দ্বিতীয় ডোজ সম্পর্কে তাদের কার্ডে লিপিবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ টিকাদানকারীদের মধ্যে সন্দেহ, নির্দিষ্ট তারিখে দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাওয়া যাবে কিনা।
টিকা কেন্দ্রে অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার অভিযোগ :
নগরীর ২৭ নং ওয়ার্ড এলাকার কয়েকটি কেন্দ্রে কিছু অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন টিকা গ্রহীতারা। স্বাস্থ্যবিধি না মানার অভিযোগও রয়েছে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী শনিবার সকাল ৯ টা থেকে কেন্দ্রগুলোতে টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। নগরীর ২৭ নং ওয়ার্ডে তিনটি কেন্দ্র পূর্ব বানিয়াখামার জনকল্যাণ সমিতি, ২৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় ও সাতরাস্তা মোড় সূর্যের হাসি ক্লিনিক। সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ার কারণে ওয়ার্ডের অধিকাংশ বাসিন্দা জনকল্যাণ সমিতির কার্যালয়ের সামনে ভিড় করতে থাকে। লকডাউনের কারণে ফটোস্ট্যাটের দোকান বন্ধ থাকায় অনেকে আইডি কার্ড ফটোকপি করতে পারেনি। ফলে টিকা না দিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন তারা। প্রথমদিনে প্রতিবন্ধী ও পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স্ক মানুষের টিকা দেওয়ার কথা বললেও সেখানে তা ঠিকমতো অনুসরণ করা হচ্ছে না। অনেকের অভিযোগ টিকা কেন্দ্রে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের পরিচিত মানুষদের আগে টিকা দিচ্ছেন। টিকা নিতে আসা আব্দুল গফ্ফার জানান, ‘সকালে টিকা কেন্দ্রে এসেছি। জানতে পারলাম যে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পঞ্চাশের নিচের বয়সের লোকজন টিকা নিচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকদের তেমন আগ্রহ নেই। একে অপরের গা ঘেঁষে রয়েছেন। ” অপরদিকে টিকা গ্রহীতা নিজাম শেখ জানান, অদক্ষ কর্মী দিয়ে এখানে টিকা দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে অধিকাংশই উদাসীন। এখান থেকে করোনা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।” পূর্ব বানিয়াখামার জনকল্যাণ সমিতি কেন্দ্রে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক জিহাদুর রহমান জিহাদ জানান, বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ টিকা নিতে আসছে। এখানে দুজন দক্ষ টিকাদানকারী জনগণকে টিকা দিবেন। সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে টিকা গ্রহীতার সংখ্যাও বাড়ছে। জনবলের অভাবে তারা সামাজিক দূরত্ব ঠিকমতো বজায় রাখতে পারছেন না। যেভাবে সংক্রমিত হচ্ছে মানুষ যদি সচেতন না হয় তাহলে টিকা দিয়ে কোন লাভ হবে না। এদিকে, তিন ঘন্টার মধ্যে সকল কেন্দ্রের টিকা ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেডিকেল অফিসার স্বপন কুমার হালদার বলেন, নগর স্বাস্থ্য ভবনে ৪৫ হাজার ২শ’ ডোজ মডার্নার টিকা মজুদ আছে। যা পরবর্তী ১৪ আগস্ট দেয়া হবে। তবে, টিকা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও বিশৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, টিকা না নিয়ে কেউ ফিরে গেছেন কি-না তা তার জানা নেই। তবে, এটি পরীক্ষামূলক হওয়ায় কিছু ত্রুটি হতে পারে। যা পরবর্তী তারিখে ঠিক করা হবে।

ভাগ