‘আফগান যুদ্ধে শতভাগ হেরে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, বিফলে গেছে রক্তপাত, নতুন ভিয়েতস্তান’

লোকসমাজ ডেস্ক॥ আফগান যুুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শতভাগ হেরে গেছে বলে মনে করেন এই যুদ্ধের কিছু মার্কিন যোদ্ধা। তারা বলছেন, আফগানিস্তানজুড়ে যে রক্তপাত হয়েছে, তা বিফলে গেছে। শত শত যোদ্ধা, সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে। কিন্তু সেসব মানুষের রক্ত, তাদের জীবন- সবই পরাজিত হয়েছে। যুদ্ধে হেরে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বেশ কিছু যোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে এমন রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এমনই একজন যোদ্ধা স্পেশাল অপারেশন্স ফোর্সেস মেরিন রেইডারের জেসন লিলি (৪১)। তিনি ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে বহুবিধ পর্যায়ে যুদ্ধ করেছেন।
আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার নিয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, প্রেসিডেন্ট তার দেশের জন্য ভালবাসা প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত একই সঙ্গে রাজনীতিকদের জন্য বিরক্তিকর। অন্যদিয়ে এখানে ওখানে যে রক্ত ও অর্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তার প্রতি হতাশাজনক অবস্থা। এই যুদ্ধে কমরেডরা নিহত হয়েছেন। যুদ্ধে বিকলাঙ্গ হয়েছেন। আর প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এই যুদ্ধ বিজয় সম্ভব নয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেশ এবং নিজের জীবনকে নিয়ে নতুন করে ভেবেছেন।
লিলি বলেন, এই যুদ্ধে আমরা শতভাগ হেরে গেছি। পুরো যুদ্ধটা ছিল তালেবান থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। তালেবানরা আবার ফিরছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, আফগান জনগণকে অবশ্যই তাদের নিজেদের ভবিষ্যতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে। বিজয় সম্ভব নয় এমন একটি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আরো একটি প্রজন্মকে উৎসর্গ করতে পারে না।
উল্লেখ্য, প্রায় ২০ বছর আগে আল কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলা চালায়। সেই থেকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে যুক্তরাষ্ট্রের এবং মিত্রবাহিনীর কমপক্ষে ৩৫০০ সেনা সদস্য নিহত হয়েছে। মারা গেছেন কমপক্ষে ৪৭০০০ বেসামরিক আফগান নাগরিক। আরো মারা গেছেন কমপক্ষে ৬৬ হাজার আফগান সেনা সদস্য। কমপক্ষে ২৭ লাখ আফগান নাগরিক দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এসব তথ্য পক্ষপাতহীন ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের।
এসব নিয়েই প্রশ্ন লিলির। তিনি বলেন, এর কি মূল্য আছে? এটাই বড় প্রশ্ন। প্রায় ১৬ বছর ধরে ইরাক ও আফগানিস্তানে আমেরিকার গেøাবাল ওয়্যার অন টেররের স্বপক্ষে ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করেছেন লিলি। তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম সেখানে সেনাদের মোতায়েন করা হয়েছে শত্রæদের পরাজিত করতে। অর্থনীতি উন্নত করতে এবং পুরো আফগানিস্তানের উন্নতির জন্য। কিন্তু তারা তাতে ফেল করেছে। তার ভাষায়, আমি মনে করি একটি জীবনও উভয় পক্ষের জন্য কোনো মূল্য বয়ে আনেনি। লস অ্যানজেলেসের গ্রার্ডেন গ্রোভ থেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন লিলি।
লিলি একাই যে প্রায় ২০ বছর পরে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার নিয়ে মন্তব্য করেছেন এমন নয়। বহু আমেরিকান তাদের মত দিয়েছেন। লিলি এবং অন্য বর্ষীয়ান যোদ্ধাদের মূল্যায়ন হয়তো কোনো যুদ্ধে প্রবেশের ক্ষেত্রে কি পরিমাণ মূল্য দিতে হবে সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে তথ্য দিতে সহায়তা করবে। আফগানিস্তান থেকে শিক্ষা পেতে সহায়তা করবে। লিলির মতামত তার ব্যক্তিগত এবং অন্য যোদ্ধাদের সঙ্গে তার মতের পার্থক্যও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে যুদ্ধের ফলকে অন্যভাবে দেখেন। যেমন নারী অধিকারের উন্নতি হয়েছে। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিলের সদস্যরা পাকিস্তানে আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করেছে।
আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সমর্থন আছে। ১২ থেকে ১৩ই জুলাই রয়টার্স/ইপসোস জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, প্রতি ১০ জন ডেমোক্রেটের মধ্যে প্রায় তিনজন এবং প্রতি ১০ জন রিপাবলিকানের মধ্যে মাত্র চারজন মনে করেন আফগানিস্তানে সেনাদের থাকা উচিত ছিল।
লিলি এবং অন্য মেরিন- যারা আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছেন এবং রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন, তারা আফগান যুদ্ধকে তুলনা করেন ভিয়েতনামের সঙ্গে। তারা বলেন, এই দুটি যুদ্ধেই কোনো স্পষ্ট বিজয় ঘোষণা করা হয়নি। লিলির বক্তব্যের অংশবিশেষ সমর্থন করেন সাবেক মেরিন স্কাউট স্নাইপার জর্ডান লেয়ার্ড (৩৪)। ইরাক এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধকে তারা তুলনা করেন বলেন, এটা ছিল ‘ভিয়েতস্তান’। লেয়ার্ড বলেন, আপনাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের যোদ্ধাদের বিষয়ে। তারা অঙ্গ হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। লেয়ার্ড দায়িত্ব পালন করেছেন আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের সাঙ্গিন উপত্যকায়।
২০১০ সালের অক্টোবর থেকে ২০১১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এখানে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে। লেয়ার্ড বলেন, প্রথম তিন মাসের যুদ্ধে তার ইউনিটের ২৫ জন সদস্য নিহত হয়েছে। কমপক্ষে ২০০ আহত হয়েছে। তার হাতের ওপর রক্ত ঝরতে ঝরতে তার বেস্টফ্রেন্ড মারা গেছে।
লিলি বলেন, আফগানিস্তানে অবস্থানকালে তিনি বুঝতে পেরেছেন কেন ইতিহাসবিদরা আফগানিস্তানকে ‘সা¤্রাজ্যের করবখানা’ বলেন। বিংশ শতাব্দীতে দু’বার আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় বৃটেন। ১৮৪২ সালে সেখানে তারা সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক পরাজয়ের অন্যতম এক পরাজয় বরণ করে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানকে দখল করে রেখেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ১৫০০০ সেনা সদস্য নিহত এবং হাজার হাজার আহত হওয়ার পরই তারা আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। লিলি বলেন, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়মের বিষয়ে তিনি বিশেষত এক বৈকল্যে ভোগেন। উদাহরণ হিসেবে, তাকে এবং অন্য ইউনিটকে রাতের বেলা তালেবানদের আস্তানায় ঘেরাও বা অভিযান চালাতে অনুমতি দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, বাচ্চাদের চুম্বন করতে দেয়া হতো না আমাদেরকে। সেখানে আমরা কিছুই করতে পারতাম না। আমরা আসলে চেষ্টা করেছি এবং ব্যর্থ হয়েছি।
লিলির এসব বক্তব্যের বিষয়ে ইউএস মেরিন কোরের কাছে জানতে চায় রয়টার্স। কিন্তু তারা রয়টার্সকে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেয়।

ভাগ