লোকসমাজ ডেস্ক॥ শ্রীলংকা ও গ্রিসে চীনের তথাকথিত ঋণ-ফাঁদ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। এবার জানা যাচ্ছে ইউরোপের দেশ মন্টিনিগ্রোতেও একই ধরণের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির রাজধানী পডগোরিচার উপকন্ঠে চীনের অর্থায়নে একটি হাইওয়ে প্রকল্প নির্মাণের কাজ চলছে। দেশটিতে এখন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে, এই মহাসড়কের ব্যয় ও ঋণ নির্বাহ করতে গিয়ে পুরো দেশের অর্থনীতিই পঙ্গু হয়ে পড়তে পারে! বর্তমানে মহাসড়কটির কাজ রাজধানী শহর থেকে শুরু হয়ে পূর্বের একটি পাহাড়ি অঞ্চলে গিয়ে থেমে আছে। এই কাজের দায়িত্বে আছে চীনের রাষ্ট্রীয়-মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত থাকায় মানুষজন এখনও নিচের পুরোনো সড়কই ব্যবহার করছে। মহাসড়ক নির্মাণের অর্থায়ন এখনও সম্পন্ন হয়নি মন্টিনিগ্রোর। তার আগেই চীনের কাছ থেকে নেওয়া ধারের পরিমাণ দেশের জিডিপির আকারের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও এ খবর দিয়েছে।
খবরে বলা হয়, চীনের একটি রাষ্ট্র পরিচালিত ব্যাংক থেকে মন্টিনিগ্রোকে প্রকল্পটির জন্য ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার কথা রয়েছে। চলতি মাসে ওই ঋণের প্রথম কিস্তি পাবে মন্টিনিগ্রো। দেশটিতে ইতিমধ্যেই প্রকল্পটির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তীব্র হতে শুরু করেছে। মন্টিনিগ্রোর সাবেক বিচারমন্ত্রী দ্রাগানসক জানান, আর্থিক ক্ষতির কথা বাদেও, এই মহাসড়কটি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। তিনি বলেন, নির্মাণ শেষ হয়ে গেলেও এই রাস্তা দিয়ে কোথাও যাওয়া যাবে না। আমরা একটা কৌতুক বানিয়েছি। এটা হচ্ছে এমন এক হাইওয়ে, যেটি দিয়ে কোথাও থেকে কোথাও যাওয়া যায় না।
প্রকল্প অনুসারে, মহাসড়ক হবে মোট ২৭০ মাইল লম্বা। এর মধ্যে ২৫ মাইল নির্মিত হবে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে, মন্টিনিগ্রোর বার বন্দর থেকে সাইবেরিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড পর্যন্ত। এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়ার জন্য দেশটির সাবেক নেতারা সমালোচিত হয়েছেন। এর সঙ্গে জুড়ে এসেছে বিশাল ঋণের বোঝা, যেমনটা বিভিন্ন মহাদেশে চীনের নানা অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে আগেও দেখা গেছে। এর পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন, মন্টিনিগ্রোকে চীনের হাতে তুলে দিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউয়নিয়ন (ইইউ)।
আকাশচুম্বী ব্যয়
মন্টিনিগ্রো সরকারের মতে, হাইওয়েটির প্রথমভাগই দেশটিকে এত ঋণের মাঝে ঠেলে দিয়েছে যে, তাদের পক্ষে বাকিটা নির্মাণ করা সম্ভব নয়। দ্রাগানসক বলেন, আমার মনে হয় আমাদের প্রজন্ম তো বটেই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর ব্যয় শোধ করতে হবে। তবে আমার মনে হয় না, চীনের জন্য এটা কোনো সমস্যা। খারাপ সিদ্ধান্তের দায় আসলে আমাদের।
মন্টিনিগ্রোর সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনের চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৪ সালে। এর অর্থায়ন করছে দেশটির এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক। চুক্তি অনুসারে, সময়মতো ব্যাংকে ঋণ ফেরত না দিতে পারলে মন্টিনিগ্রোর অভ্যন্তরে সামরিক বা কূটনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হয় না এমন জমি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার রয়েছে চীনের। পাশাপাশি, মন্টিনিগ্রোর সাবেক সরকার ওই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে চীনা আদালতের হাতে!
প্রকল্পটি নিয়ে সৃষ্ট অবস্থা থেকে মন্টিনিগ্রোকে বাঁচাতে ইইউ’র প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সরকার। দেশটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অংশ হতে চায়। গত বসন্তে এ নিয়ে দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী দ্রিতান আবাজোভিচ বলেন, আমরা আমাদের বিগত সরকারের অত্যন্ত খারাপ একটি সিদ্ধান্তের ভিকটিমে পরিণত হয়েছি। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের চুক্তিতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো অবিশ্বাস্য। এগুলো কোনোমতেই স্বাভাবিক নয়। এগুলোর পেছনে জাতীয় স্বার্থ থাকার কোনো যৌক্তিকতাই নেই।
চীনের লক্ষ্য
প্রকল্পটি ঘিরে আরেকটি বিভ্রান্তির বিষয় হলো এতে চীনের আগ্রহ। বহু বছর আগ থেকেই এই প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল মন্টিনিগ্রোর। কিন্তু ইউরোপীয় ব্যাংকগুলো এতে অর্থায়নে কোনো আগ্রহ দেখায় নি। পডগোরিচা-ভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের প্রেসিডেন্ট মিলিকা কোভাসেভিচ বলেন, মন্টিনিগ্রো ঋণ ফেরত দিতে পারবে বলে বিশ্বাস ছিল না ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর।
কোভাসেভিচ দীর্ঘদীন ধরে মন্টেনিগ্রোতে রুশ বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে রাশিয়ার নীতিমালা আমরা পুরোপুরি বুঝি। কয়েকশ’ বছরেও তাদের নীতিমালা পাল্টায়নি। এখানে জমি দখলের ইচ্ছা নেই তাদের। তারা মূলত অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে রাখতে চায়। পাশাপাশি, এই অঞ্চল থেকে পশ্চিমাদের দূরে রাখতে চায়। আমরা সেসবের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারি। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় না কেউ বোঝে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য আসলে কী।
তবে থিংকট্যাংক ‘বেলগ্রেড ফান্ড ফর পলিটিক্যাল এক্সসিলেন্স’র কর্মসূচী সমন্বয়ক স্টেফান ভ্লাদিসাভলেজেভ মনে করেন, মন্টিনিগ্রোতে চীনা আগ্রহের কারণ তিনি জানেন। বহু বছর ধরে সার্বিয়ায় চীনা প্রকল্পের খোঁজ রাখছেন তিনি। এসব প্রকল্পের পেছনে বেইজিংয়ের বিস্তৃত রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি। মন্টিনিগ্রোতে চীনের এসব কার্যক্রমের রাজনৈতিক লক্ষ্য আরো বেশি সুদূরপ্রসারী। কেননা একাধিকবার ইইউ’র কাছে চীনের ঋণ শোধে সাহায্য চেয়েও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে মন্টিনিগ্রোর।
ভ্লাদিসাভলেজেভ বলেন, এ অঞ্চলে প্রভাব বৃদ্ধির ভালো সুযোগ হারিয়েছে ব্রাসেলস। এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধিতে ইইউ পারতো এখানে সহায়তার সিদ্ধান্ত নিতে। তিনি বলেন, কিন্তু চীনকে এগিয়ে আসার সুযোগ দিয়ে দেশটিতে চীনা প্রভাব ছড়ানোর পথ করে দিয়েছে ইইউ।
তিনি বলেন, পশ্চিম বলকান দেশগুলো ইইউ’র অংশ না হওয়ায় জোটটির কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজস্ব পররাষ্ট্র ও জাতীয় নীতিমালা ঠিক করতে পারে তারা। ইউরোপীয় উপত্যকায় প্রবেশের সহজ পথ এটি। ইইউ’র পার্শ্ববর্তী দেশে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সহজ পথ।
চীন বহুদিন ধরে এমনটাই চাইছে। ইইউ’র পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য বহু বছর ধরে কাজ করছে তারা। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের আওতায় গ্রিসের পারিয়াস বন্দর কিনে নিয়ে সেটিকে ভূমধ্যসাগরের দ্বিতীয় বৃহৎ বন্দরে রূপ দিয়েছে চীন। বেলগ্রেড থেকে শুরু করে বুদাপেস্ট পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মাণ করেছে হাইওয়ে, রেলওয়েসহ অসংখ্য অবকাঠামো।
মন্টিনিগ্রোতে অবস্থিত চীনা দূতাবাসে সাক্ষাৎকার চেয়ে অনুরোধ করেছিল এনপিআর। তবে তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। একই প্রতিক্রিয়া মিলেছে মন্টিনিগ্রো সরকারের কাছ থেকে থেকেও। ভ্লাদিসাভলেজেভ মনে করেন, ইইউ’র কাছ থেকে সহায়তা চাওয়ার পর আচমকা মন্টিনিগ্রো সরকারের এ নীরবতা পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনি মনে করেন, চীনের সঙ্গে ঋণের শর্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা করছে মন্টিনিগ্রো সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এমনটাই করেছে বেইজিং।
ফেরারি কেনার মতো
এদিকে, রাজধানী পডগোরিচার উপকন্ঠে হাইওয়ের উপর টুলবুথ ও সুড়ঙ্গ নির্মাণ শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। ইউরোপিয়ান ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ-এর সহযোগী অধ্যাপক ম্লাডেনগ্রেগিচ বলেন, হাইওয়েটির যত সমস্যাই থাকুক না কেন, মন্টিনিগ্রোর ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা এটি। তাদের জন্য এমন হাইওয়ে তৈরি করা অনেকটা গড়পড়তা বেতন দিয়ে ফেরারি কেনার মতো। আর এরপর ভাবা, ওহ, আমার কাছে তো এর গ্যাস কেনার টাকাও নেই!
গ্রেগিচ বলকান অঞ্চলে চীনা প্রকল্পগুলোর উপর তার ডক্টরাল থিসিস করছেন। তিনি জানান, এসব প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। এগুলোর সবগুলোই রাজনৈতিক। আর এখন বলকানে সবকিছু এভাবেই করা হয়। উঠতি পরাশক্তি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে দুর্নীতি করা বেশ সহজ।
মন্টিনিগ্রোর উপ-প্রধানমন্ত্রী আবাজোভিচ গত মে মাসে বলেছিলেন, সাবেক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চীন-নির্মিত হাইওয়েটি ঘিরে উঠা দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইচ্ছুক তিনি। কিন্তু এরপর ইইউ’র কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর থেকে ওই তদন্ত নিয়েও চুপ হয়ে গেছেন আবাজোভিচ। প্রকল্পটির জন্য নেওয়া ঋণ শোধ করা বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় গেছে দেশটি।





