সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও তৃপ্তি বোধ করার অবকাশ নেই

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু রোধে লকডাউন সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসাবে মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা। গত বছরাধিক কাল ধরে দেশে দেশে করোনা ঠেকাতে এই পদ্ধতিই অনুসৃত হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে একবার নয়, দুই বা ততোধিকবার লকডাউনের আশ্রয় নেয়া হয়েছে, আমাদের দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর দ্বিতীয়বার সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, যা অব্যাহত আছে। এই লকডাউনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হয়েছে। যেমন, শিল্পকারখানা ও উৎপাদন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুরুতে দোকানপাট, গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলেও সম্প্রতি দোকানপাট খুলে দেয়া হয়েছে। বলতে গেলে গণপরিবহন ছাড়া আর সব কিছুই সচল হয়েছে। লকডাউনের আগে সংক্রমণ ও মৃত্যু এমনভাবে বেড়ে গিয়েছিল, যাতে উদ্বিগ্ন ও বিচলিত না হয়ে উপায় ছিল না। একদিনে সংক্রমণ সাড়ে সাত হাজার ও মৃত্যু শতাধিক পর্যন্ত হয়েছে। আলহামদুল্লিাহ! আল্লাহর রহমতে এবং কঠোর লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ফলে এখন সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। গত ৩০ এপ্রিল সংক্রমণের সংখ্যা ২১৭৭-এ নেমে এসেছে। ওইদিন মৃত্যু হয়েছে ৫৭ জনের। গত ২১ দিনের মধ্যে এটা সর্বনিম্ন। আইসিইউ বেড ও অক্সিজেনের জন্য যে হাহাকার উঠেছিল, তা এখন নেই। এ দু’ ক্ষেত্রে চাপ কমেছে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর হারের এই নিম্নগতিতে, সন্দেহ নেই,সবাই আশ্বস্থ হবে। এ জন্য মহান আল্লাহকে অশেষ শুকরিয়া। সরকারের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তও বলা বাহুল্য, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এজন্য সরকারও ধন্যবাদের ভাগীদার। তবে উদ্বেগ এখনো যথেষ্ট বিদ্যমান। প্রতিবেশী ভারতে করোনার রীতিমত তান্ডব চলছে। এখনো ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে সেখানে। কথিত ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ও মৃত্যু কল্পনা ও ধারণাকেও হার মানিয়েছে। একটানা তিন দিন ভারতে করোনায় মৃত্যু হয়েছে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের। আর একদিনে শনাক্ত হয়েছে ৩ লাখ ৮৬০০০ রোগী।
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টটি সবচেয়ে ভয়ংকর। ইতোমধ্যে এই ভ্যারিয়েন্ট ডজনাধিক দেশে অনুপ্রবেশ করেছে। বাংলাদেশেও এই ভ্যারিয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। সরকার দ্রæত সীমান্ত ও জনযাতায়াত বন্ধ করে দেয়া কাঙ্খিত সুফল পাওয়া গেছে বটে তবে এতে তৃপ্তি বোধ করা যাবে না। যে কোনো সময় এই ভ্যারিয়েন্টে বাংলাদেশে ছড়িয়ে ব্যাপক সংক্রমণ ও প্রাণহানি ঘটাতে পারে। কাজেই, সীমান্তে সতর্কতা বজায় রাখতে হবে, কড়াকড়ি অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লকডাউন কঠোরভাবে বলবৎ করা সম্ভব হলে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরো অনেক কম হতে পারতো। লকডাউনের মধ্যে শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে মানুষ যাতায়াত করেছে। বাজারঘাট ও দোকানপাটে গেছে প্রায় অবাধে। তারা অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানেনি। এতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। সামনে ঈদুল ফিতর। এ উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে পারে। আবার দু’ চার দিন পর শহরে ফিরতে পারে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, গত বছর ঈদের আগে অনেক মানুষ পাগলপারা হয়ে গ্রামে ছুটে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছিল। এই যাতায়াতের ফল ভালো হয়নি। এরপর সারাদেশেই করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এবারও তেমন আশংকা যেহেতু রয়েছে, সুতরাং আগে থেকে সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। যারা যেখানে আছে, ঈদের সময়ও তাদের সেখানেই থাকতে হবে-এই নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার বিকল্প নেই। যারা ঈদ করতে, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগী করতে উদগ্রীব, উৎসাহী, তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এই ঈদযাত্রা তাদের ও তাদের আত্মীয়স্বজন এবং প্রিয়জনদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। আগে জীবন, পরে আনন্দ-উৎসব। বেঁচে থাকলে আনন্দ-উৎসব বহু করা যাবে। কোনোভাবেই জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।
এটা প্রমাণিত, লকডাউন যথাযথভাবে কার্যকর ও সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হলে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমে আসতে বাধ্য। চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ কঠোর লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি বলবৎ করায় আশাতীত সুফল পেয়েছে। তাদের জনজীবন ও কর্মপ্রবাহ প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। পক্ষান্তরে যেসব দেশ তা উপেক্ষা করেছে, তারা এখনো ঘোরতর মুসিবতে রয়েছে। এটা ঠিক, অনির্দিষ্টকাল লকডাউন কার্যকর রাখা সম্ভব নয়। সন্তোষজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সাপক্ষে লকডাউন প্রত্যাহার করা উচিৎ। আমরা জাতীয় প্রয়োজন ও স্বার্থের কারণেই লকডাউন আারো অধিকদিন চালিয়ে যেতে পারবো না। জীবন-জীবিকা, উৎপাদন, অর্থনীতি সচল করার উদ্যোগ আমাদের নিতেই হবে। এই প্রেক্ষাপটে লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল নির্ধারণ করেছে করোনা প্রতিরোধে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি। কমিটি ১০টি সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে মাস্ক পরা, অফিসে উপস্থিতি অর্ধেক করা, গণপরিবহনে সক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করা, দোকানপাট, শপিংমল লম্বা সময়ের জন্য চালু রাখা, জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করা, কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ রাখা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পরামর্শক কমিটি আইসোলেশন, কন্ট্রক্ট ট্রেসিং এবং কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার কথাও বলেছে। সুপারিশগুলো কার্যকর করা গেলে পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা যায়। অবশ্য এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, করোনা সহসা বিদায় নেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার মধ্যেই আমাদের বহুদিন বসবাস করতে হতে পারে। সেজন্য করোনার পরীক্ষা, করোনা চিকিৎসায় বিশেষায়িত হাসপাতাল বহাল রাখাসহ চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা, অক্সিজেন ও আইসিইউ’র প্রয়োজনীয় সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুরুতর রোগীদের ঢাকায় নিয়ে আসা হচ্ছে। তাই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে করোনা চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি এবং আইসিইউ ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। মহাখালির বৃহৎ করোনা চিকিৎসাকেন্দ্রসহ অন্যান্য হাসপাতাল, যন্ত্রপাতি, ওষুধপত্র ও চিকিৎসক-নার্স নিয়ে প্রস্তুত রাখতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষা ও টিকাদান কর্মসূচী আরো জোরদার করতে হবে।

 

ভাগ