পদ্মাপাড়ে আহাজারি : ২৬ জনের লাশ উদ্ধার

লোকসমাজ ডেস্ক॥ শোকের মাতম বইছে মাদারীপুরের শিবচরে। গতকাল দিনভর অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে তিন শিশু ও দুই নারীসহ ২৬ জনের লাশ। পদ্মা নদীতে স্পিডবোট দুর্ঘটনা নতুন না। কিন্তু স্পিডবোট উল্টে এত মানুষের মৃত্যু আগে কখনো দেখেনি মাদারীপুরের শিবচরের লোকজন। তাও দুর্ঘটনাটি ঘটেছে লকডাউনে যখন সারা দেশে নৌ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ওই সময়ে সরকারি নির্দেশ না মেনে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটে যাচ্ছিলো স্পিডবোটটি। বাংলাবাজার পুরনো ঘাটে বালু বোঝাই একটি বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে স্পিডবোটটি উল্টে যায়। গতকাল সকালে বাংলাবাজার পুরনো ঘাটে পদ্মা নদীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে গতকাল সকাল পৌনে ৭টায় ৩১ জন যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটটি ছেড়ে আসে। এ সময় মাদারীপুর কাঁঠালবাড়ী বাংলাবাজার পুরনো ঘাটে থেমে থাকা বালু বোঝাই একটি বাল্কহেডে ধাক্কা দিয়ে ডুবে যায় স্পিডবোটটি। বোটের যাত্রীরা তখন পানিতে পড়ে বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা করতে থাকেন। পানিতে ডুবে মারা যান অধিকাংশ যাত্রী। এক শিশুসহ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের উদ্ধার করে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে সেখানে এক নারীর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশ। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ১৭ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়াও দুর্ঘটনায় আহত পাঁচজনকে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। ওই পাঁচজনের মধ্যে একজন ওই স্পিডবোটের চালক শাহ-আলম। তাকে আটক করেছে পুলিশ। স্বজন হারিয়ে পদ্মার তীরে চিৎকার করে কাঁদছিলেন আদুরি বেগম। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও স্বামী সন্তানকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, শিমুলিয়া ঘাট থেকে গাদাগাদি করে যাত্রী নিয়ে স্পিডবোট ছাড়েন চালক। যাত্রার শুরু থেকে এলোমেলোভাবে স্পিডবোট চালাচ্ছিলেন চালক। শুরুতে একবার বোটটি উল্টো যাচ্ছিল। এজন্য চালককে দায়ী করেন স্বামী-সন্তান হারানো আদুরি বেগম । এ ঘটনায় মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন, শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান, শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিরাজ হোসেন, শিমুলিয়া বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. শাহাদাত হোসেন, মাদারীপুর শিবচর চরজানাজাত নৌ-পুলিশ ইনচার্জ শেখ মো. আব্দুর রাজ্জাক ও নারায়ণগঞ্জ পাগলা বাংলাদেশ কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার লে. আসমাদুল। মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করেছি। যারা দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। স্পিডবোটটি মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে বাংলাবাজার আসে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্পিডবোট ছাড়ে। এসব বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। মর্মান্তিক নৌ-দুর্ঘটনায় যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। লকডাউনের মধ্যে স্পিডবোটটি সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই চলাচল করছিলো বলে জানিয়েছেন নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক। তিনি বলেন, স্পিডবোটটির চালক চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গোপনে যাত্রী তুলে পারাপার করছিল। এ ঘটনায় স্পিডবোটের চালককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে জানিয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, এই লকডাউনের সময় এমনিতেই এই ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। তারপরও কেন বের হয়েছিলো বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্পিডবোটের চালক গুরুতর আহত। তাকে পুলিশের নজরদারিতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে রেফার করেছেন বলে জানান তিনি।
স্পিডবোট দুর্ঘটনায় নিহতরা হচ্ছেন, খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার বারুখালির মনির মিয়া (৩৮), হেনা বেগম (৩৬), সুমী আক্তার (৫) ও রুমি আক্তার (৩), ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙা গ্রামের আরজু শেখ (৫০), ইয়ামিন সরদার (২), মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার সাগর ব্যাপারি (৪০), কুমিল্লা দাউদকান্দির কাউসার আহম্মেদ (৪০), রুহুল আমিন (৩৫), মাদারীপুর জেলার রাজৈরের তাহের মীর (৪২) ও কুমিল্লা তিতাসের জিয়াউর রহমানের (৩৫), মাদারীপুরের শিবচরের হালান মোল্লা (৩৮), শাহাদাত হোসেন মোল্লা (২৯), বরিশাল তেদুরিয়ার আনোয়ার চৌকিদার (৫০), মাদারীপুর রায়েরকান্দি মাওলানা আব্দুল আহাদ (৩০), চাঁদপুর জেলার উত্তর মতলব মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫), নড়াইল লোহাগড়া রাজাপুর জুবায়ের মোল্লা (৩৫), মুন্সীগঞ্জ সদর সাগর শেখ (৪১), বরিশাল মেহেন্দীগঞ্জ সায়দুল হোসেন (২৭), রিয়াজ হোসেন (৩৩), ঢাকা পিরেরবাগ খোরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠি নলসিটি এসএম নাসির উদ্দীন (৪৫), বরিশাল মেহেন্দীগঞ্জের মো. সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিরোজপুর চরখামা মো. বাপ্পি (২৮), পিরোজপুর ভাণ্ডারিয়া জনি অধিকারী (২৬) মোট ২৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।
লকডাউনের মধ্যে অবৈধ স্পিডবোট কীভাবে চলছিল?
দক্ষিণ অঞ্চলের ২১টি জেলার প্রবেশদ্বার মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে চলাচল করে চার শতাধিক স্পিডবোট। যার অধিকাংশের কোনো নিবন্ধন নেই। সবই চলছে অবৈধভাবে। তাই প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। এ বিষয়ে অনেকটা দায়সারা ভূমিকা রাখছেন কর্তৃপক্ষ। লকডাউনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যাত্রী নিয়ে নদী পারাপারের সময় গতকাল মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬ জন। এ ঘটনার পর আবার আলোচনায় এসেছে অবৈধ স্পিডবোট। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই এই অবৈধ যান নিয়ে আলোচনা হয়। পরে আর কাজের কাজ কিছুই হয় না। শিমুলিয়া ঘাটে ২শ’ ২০টি ও কাঁঠালবাড়ী ঘাটে ২শ’ স্পিডবোট রয়েছে। যার মধ্যে ৪০-৫০টি স্পিডবোটের নিবন্ধন রয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৯৪ সাল থেকে গত ২৬ বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬৬১টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ। এসব ঘটনায় আড়াই শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র চার-পাঁচটি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়েছে প্রায় ৯০০টি। এ সকল দুর্ঘটনায় সুপারিশের ভিত্তিতে কয়েক হাজার মামলা হলেও বড় ধরনের শাস্তির নজির নেই। ঢাকার নৌ-আদালতের (মেরিন কোর্টে) কয়েক বছরের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, দায়েরকৃত ৩৬টি নৌদুর্ঘটনার মামলার মধ্যে মাত্র দুটির রায় হয়েছে। প্রায় তিন হাজার নৌ-আইন ভঙ্গজনিত মামলার মধ্যে মাত্র ৪০টির মতো মামলায় অভিযুক্তদের জরিমানা করা হয়। বর্তমানে এই আদালতে বিভিন্ন সময় দায়েরকৃত কয়েক হাজার মামলা চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক (বওপ) কাজী ওয়াকিল নওয়াজ বলেন, তাদেরকে প্রথম থেকেই বলা হচ্ছে এগুলো (স্পিডবোট) চলবে না। তারপরেও তারা প্রশাসন এবং বিআইডব্লিউটিএ’র চোখকে ফাঁকি দিয়ে যে যেভাবে পারছে যাত্রী বহন করছে। ঘাটে বিআইডব্লিউটিএ’র পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে আড়াল থেকে যাত্রী তুলে নিয়ে যায়। ফলে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ঘটে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বিআইডব্লিউটিএ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে যাত্রী সাধারণ এবং পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এককভাবে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনা এড়াতে আগের নির্দেশনার সঙ্গে নতুন করে কঠোর নির্দেশনা ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি। মাদারীপুরের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, আমরা প্রথম থেকেই কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। লকডাউনে নৌরুটে যে সকল নৌযান চলাচল করার কথা ছিল সেগুলো সব বন্ধ আছে। ঘাট এবং নৌরুট দু’টোই আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। গতকালের ঘটনায় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নৌরুটের ঘাট থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে গিয়ে চুরি করে যাত্রী তুলে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে না থেমে অন্যত্র হয়ে যাওয়ার সময় একটি বালিবাহী নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নির্দিষ্ট নৌরুটে কিন্তু তারা চলাচল করছে না। এবং তারা ঘাটেও আসে না। আমরা কিন্তু ঘাট এবং নৌরুটে দায়িত্ব পালন করছি। তিনি বলেন, লকডাউনের মধ্যে স্পিডবোট চলছে এটা সঠিক নয়। কিন্তু এভাবে চুরি করে অনেক সময় দু’একটি নৌযান চলে। আমরা ঘাট এবং স্পিডবোট মালিক সমিতি, শ্রমিকদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আরো জোরদার পদক্ষেপ অব্যহত থাকবে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান এই পুলিশ সুপার।

ভাগ