সুন্দর সাহা॥ বেনাপোল-পেট্রাপোলে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরা শুরু হয়েছে। মেডিকেল ভিসা নিয়ে আত্মীয়-পরিজন এর চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন অনেক মানুষ। বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অনেকেই জানতেন না। আর তাই অন্যবারের মতো সীমান্তে পৌঁছান তারা। অনেক দেনদরবার করেও তারা সোমবার পর্যন্ত দেশে ঢুকতে পারেননি। গতকাল মঙ্গরবার রাত সাড়ে আটটায এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এনওসি নিয়ে বাংলাদেশে ফিরেছেন ১৩৫জন এবং ভারতে প্রবেশ করেছেন ৩০জন।
ভারতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেই ঢেউ সুনামির মতো গ্রাস করছে পশ্চিমবঙ্গেও। রাজ্যে প্রতিদিন ১৫ হাজারের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার ২৬ এপ্রিল থেকে ৯ মে পর্যন্ত ভারত সীমান্তে চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে। আর তাতেই শোচনীয় দশায় পড়েছেন ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের স্থলবন্দর দিয়ে ১৪ দিনের জন্য যাতায়াত বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিন সোমবার ক্ষোভ-বিক্ষোভ করেন আটকে পড়া প্রায তিনশত বাংলাদেশি। গতকাল থেকে কলকাতার বাংলাদেশ মিশন থেকে এনওসি নিয়ে দেশে ফেরা শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে শুধু পশ্চিমবঙ্গে কমবেশি ৯/১০ হাজারের মতো বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ রোগী। বাকিরা শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ী। বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দিয়েছে যারা দেশে ফিরবেন তাদের হাইকমিশন থেকে এনওসি সংগ্রহ করতে হবে।
সোমবার প্রায় ৩০০ মানুষ বার বার ভারতীয় অভিবাসন দপ্তরের অফিসারদের অনুরোধ করতে থাকেন তাদের যেন বাংলাদেশে যেতে দেওয়াা হয়। কিন্তু এনওসি ছাড়া কাউকেই ছাড়া সম্ভব নয় বলে জানান পেট্রাপোল চেকপোস্টের কর্তারা। আটকে পড়া বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। এনওসি ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হচ্চে ন্।া খুলনাবাসী আলমগীর হোসেন বলেন, “আমার তিন বছরের বাচ্চার হার্টে দুটো ছিদ্র আছে। ভেলোরে গিয়েছিলাম। তারা জানায় এখানে চিকিৎসা হবে না। যত তাড়াতাড়ি পারো দেশে ফিরে যাও। যখন তখন বিপদ ঘটতে পারে। এ অবস্থায় সোমবার রাত ১১টায় হাওড়া নেমে বর্ডারে চলে যাই। গিয়ে দেখি বর্ডার বন্ধ। কেন বন্ধ আগে থেকে জানতাম না। সেখানে থেকে জানালো হলো হাইকমিশনের পাস ছাড়া যাওয়া যাবে না। এখানে লাইনে কোনো শৃঙ্খলা নেই। তবে কাগজ জমা দিয়ে অনেক কষ্টে এনওসি হাতে পেয়েছি। নারায়ণগঞ্জের রায়গঞ্জের বাসিন্দা মোঃ হাবিবুর রহমান সোমবার বলেন, “দুই রাত বাচ্চাটাকে ভালোভাবে খাওয়াতেও পারিনি। আমরা মেডিকেল ভিসা নিয়ে রোগের চিকিৎসা করাতে এসেছিলাম। এখানে এসে জানতে পারলাম আমরা দেশে ফিরতে পারব না। আমাদের টাকা শেষ। এসে না ফিরতে পারলে এখানে কিভাবে থাকবো ?” বরিশালের শংকর বিশ্বাস বলেন, “পকেটে টাকা নেই, ভারতে থাকারও কোন ব্যবস্থা নেই। কিভাবে এনওসি আনতে ফের কলকাতায় ফিরবো তাই ভাবছি।” সাত বছরের মেয়ে রিয়া মন্ডলকে নিয়ে বর্ডারে গিয়ে একই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে এনওসির জন্য ফিরে কলকাতার বাংলাদেশ মিশনে ফিরে গেছেন নড়াইলের এক বাবা। তিনি বলেন, এখানে এসে বিপদে পড়েছি। হাতে টাকা নেই, থাকার জায়গা নেই, ফুটপাতেই দিন কাটাচ্ছি। ব্যাঙ্গালোরে অপারেশন করে গত সোমবার বর্ডারে যাই। সেখানকার অথরিটি বলে, বাংলাদেশের সঙ্গে কথা চলছে আমরাও চেষ্টা করছি। সেই আশায় সন্ধ্যা সাতটা অবধি বসেছিলাম বর্ডারে। পরে নিরুপায় হয়ে এনওসি আনতে চলে যেতে হচ্ছে কলকাতায়। ক্যান্সারে আক্রান্ত রুহিনার মা। কয়েক লাখ রুপি খরচ করে মাকে ক্যান্সারের চিকিৎসা করিয়েছেন। তিনিও জানতেন না বর্ডার বন্ধ। মঙ্গলবার জমা দিয়েছেন আবেদন। রুহিনা বলেন, আর একদিনও থাকলে হোটেলের ভাড়া দিতে পারবো না। আমাদের সরকারের কাছে আবেদন করছি খুব তাড়াতাড়ি এ যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিন।
এ বিষয়ে পেট্রাপোল চেকপোস্টের চিফ ইমিগ্রেশন অফিসার, তরুণ বিশ্বাস গতকাল বলেন, “কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই। কারণ যে নির্দেশের কারণে আমরা ওদের যেতে দিচ্ছি না, তা বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত। মঙ্গলবার এনওসি নিয়ে যারা এসেছেন দ্রুততার সাথে তাদের ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।” এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউজের অতিরিক্ত কমিশনার সৈয়দ ড. নিয়ামূল হকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি লোকসমাজকে বলেন, “এটা আমাদের বিষয় না। আমরা এ ব্যাপারে কিছুই জানিনা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেসন পুলিশ। এ ব্যাপারে যশোরের নাভারন সার্কেলের এএসপি জুয়েল ইমরান লোকসমাজকে বলেন, সীমান্তের ওপারে পেট্রাপোলে অনেক মানুষ আটকে পড়েছিলেন্ এনওসি নিয়ে গতকাল থেকে তারা দেশে আসতে শুরু করেছেন। বিস্তারিত জানার জন্য তিনি বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেসনের ওসির সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেসনের ওসি আহসান হাবিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি লোকসমাজকে বলেন, “বাংলাদেশ সরকার করোনা সংক্রমণ রোধে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করায় সেখানে আটকে পড়েন কয়েক হাজার বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রী। সে সব আটকে পড়া পাসপোর্ট যাত্রীদের নিজ দেশে ফেরত আসতে হলে কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন থেকে অনুমতিপত্র নিতে হবে। এছাড়া ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আরটিপিসিআর ল্যাবের করোনা টেস্টের সনদ নিয়ে দেশে ফেরার নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ সরকার। সেই মোতাবেক গতকাল পর্যন্ত ১৩৫ জন বাংলাদেশি যাত্রী দেশে ফিরেছেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে আটকে পড়া ভারতীয় পাসপোর্টধারী যাত্রীদের ক্ষেত্রেও একই নির্দেশনা জারি করা হয়। ভারতীয় যাত্রীরা বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশন থেকে অনুমতি নিয়ে ৩০ জন নিজ দেশে ফিরেছেন। বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা মো. আজিম উদ্দিন বলেন, যারা ভারতে আটকে পড়েছে শুধু তারাই কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন থেকে অনুমতি নিয়ে দেশে ফিরছেন। এছাড়া যে সব পাসপোর্টধারী যাত্রীরা দেশে ফিরছেন তাদের বাধ্যতামূলক বেনাপোলের কয়েকটি আবাসিক হোটেলে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।





