স্টাফ রিপোর্টার ॥ তীব্র গরম, করোনার ভয়, অসুস্থতা উপেক্ষা করে যশোর পৌরসভার প্রায় ২ হাজার বয়স্ক বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী মানুষ গতকাল উপস্থিত হয়েছিলেন প্রিপারেটরি স্কুল প্রাঙ্গণে। তাদের ভাতা দেওয়া হবে এ মর্মে খবর পেয়ে গেলেও এত লোকের হাজির হওয়ার দায়িত্ব নিতে রাজি হননি সমাজসেবা অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা পৌর ডিজিটাল সেন্টার কর্তৃপক্ষ। প্রখর রোদে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো এসব মানুষের মাঝে ছিল না স্বাস্থ্যবিধির বালাই বা শারীরিক দূরত্ব। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত না খেয়ে অপেক্ষা করেও অনেকে টাকা না পেয়ে ফিরে যান। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাফ কথা ৭দিন ধরে টাকা বিতরণ করা হবে। একদিনে এতো লোকের উপস্থিত হওয়ার কথা না।
সূত্রমতে, যশোর পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তালিকা অনুসারে প্রায় ৬ হাজার ভাতাভোগী রয়েছেন। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী এই ৩ শ্রেণিতে ৬ হাজার মানুষ ৫শ টাকা হারে এবং প্রতিবন্ধীরা সাড়ে ৭শ টাকা হারে ভাতা পান। প্রতি ৩ মাস অন্তর ভাতা উত্তোলন করেন তারা। পৌরসভার ভাতা ভোগীরা গত এক কিস্তির টাকা পাননি। তাই, এবার এক সঙ্গে ৬ মাসের টাকা পাচ্ছেন। এই টাকা পৌরসভার উদ্যোক্তা মো. মাসুদ রানা, পৌর কমিউনিটি সেন্টারে নির্দিষ্ট সময়ে ভাতাভোগীদের আহ্বান করে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে দিয়ে থাকেন। করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে এবং এক জায়গায় অধিক জনসমাগম না করার জন্যে সংশ্লিষ্টদের মতে মিউনিসিপ্যালিটি প্রিপারেটরি স্কুল প্রাঙ্গনে এবারের টাকা বিতরণের স্থান নির্ধারিত হয়। সংশ্লিষ্ট মতে, সকাল ১০টা থেকে প্রতিদিন ২শ থেকে আড়াইশ জনকে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভাতা দেওয়ার কথা। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে প্রিপারেটরি স্কুল প্রাঙ্গণে যেয়ে দেখা যায়, প্রখর রোদে ক্লান্ত শরীরে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ ছাতা মাথায় কেউ শুয়ে পড়ে সিরিয়াল ধরে অপেক্ষায় আছেন। তবে, প্রবেশমুখে সকল শৃঙ্খলা উপেক্ষিত। আগে যাওয়ার জন্যে সবাই ব্যস্ত। গেটে দায়িত্বরত পৌরসভার পিয়ন লাভলু বয়স্ক প্রতিবন্ধী অনেকের সাথে দুর্ব্যবহার করছে। সমাজসেবার কোনো কর্মকর্তা পৌরসভার ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা মাসুদ রানা বা পৌর কর্তৃপক্ষের কাউকে এখানে দেখা যায়নি। স্কুলটির নীচতলার ৪টি কক্ষে ব্যাংক এশিয়ার ৪টি পয়েন্টে ৮ জন এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মকর্তা কাজ করছেন। তাদের প্রধান রিলেশনশিপ অফিসার আল আমিন জানান, এদিন সুষ্ঠু ৯নং ওয়ার্ডের ভাতা ভোগীদের ২ থেকে আড়াইশজনকে টাকা দেওয়ার কথা। গতকাল থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম ৩ মে পর্যন্ত চলবে। তিনি জানান, গতকাল ৫শর বেশি জনকে ভাতা দেওয়া হয়েছে। আজো ৪টা পর্যন্ত যতজনকে পারা যায় দেওয়া হবে।
এদিকে ২নং ওয়ার্ডের প্রতিবন্ধী হৃদয় (৪৫), ৮নং ওয়ার্ডের বয়স্ক ব্রজেন্দ্রনাথ রায় (৮৫), বেজপাড়ার অতিবৃদ্ধ হাসিনা বেগম। একই এলাকার শিউলি বেগম জানান, গতকাল (২৫ এপ্রিল) এসে সারাদিন বসে থেকে ফিরে গেছেন তারা। আজ সোমবার আবার এসেছেন। ৯টা-সাড়ে ৯টা থেকে বসে আছেন এই গরম ও রোদে। তারপরও লাইনের গোড়ায় পৌঁছুতে পারছেন না। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো কীভাবে খবর পেলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে কেউ জানালেন পৌরসভার লোক জানিয়েছেন, কেউ বললেন সমাজসেবার লোক, কেউ অন্যের কাছে শুনে এসেছেন। সব মিলেয়ে এর অসহনীয় বিশৃঙ্খলার চিত্র ছিল পৌর প্রিপারেটরি স্কুল প্রাঙ্গনে। বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী ও বয়স্কের সাথে একজন করে সঙ্গী ছিলেন। অনেকে চলাচলে অক্ষম তাই রিকশা, হুইল-চেয়ার বা ইজিবাইকে পৌছেছেন সেখানে। লোকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তাদের অনেকের তেমনি স্বাস্থ্যবিধির বালাই ছিল না। সবচেয়ে কথা সমাজসেবা বা পৌর ডিজিটাল সেন্টারের ঊর্ধ্বতন কারো উপস্থিত না থাকা, ভলেন্টিয়ার হিসেবে কেউ দায়িত্ব পালন না করায় চরম অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা হুড়োহুড়ি লেগে ছিলো।
পৌরডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা ও ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিনিধি মাসুদ রানা জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তর তালিকা করে, ভাতা গ্রহীতাদের জানায়। আমাদের কাজ শুধু ফিংগার প্রিন্ট মিলিয়ে টাকা বন্টন করা। এখন থেকে একটানা খোলা হচ্ছে। আগামীতে নিজ নিজ ওয়ার্ড থেকে ভাতা গ্রহীতারা এজেন্ট ব্যাংকের মার্চেন্ট থেকে এ টাকা উঠাতে পারবেন। তখন ভিড় হবে না। সমাজসেবা অফিসার সেলিম রেজা জানান, অত ভিড় হওয়ার কথা না। মানুষ খবর পেয়েই ছুটে এসেছে। তাদেরকে মোবাইলে ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছে, ২৫ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত ওই স্পটে টাকা দেয়া হবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার জনের একান্টস সম্পন্ন হয়েছে। তারা তাদের ওয়ার্ডের মার্চেন্টের কাছ থেকে টাকা ওঠাতে পারবেন কিন্তু তারা মাঠে গেছেন। তার মতে, এ দায়িত্ব সমাজসেবা অধিদপ্তর নিতে পারে না। জানতে চাইলে সেলিম রেজা জানান, তথ্য দেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এশিয়া ও তার এজেন্ট এবং পৌরসভার ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা। এই তথ্য প্রদান বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার উদ্যোক্তা মাসুদ রানা জানান, এ দায়িত্ব সমাজসেবা অধিদপ্তরের।
সামগ্রিক বিষয়ে জানার জন্যে যশোরের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক অশিত কুমার সাহার মোবাইল ফোনে একাধিকবার লোকসমাজ দফতর থেকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।




