লোকসমাজ ডেস্ক॥ ভিন্ন জাতের ধান তোহামনি। বিজাতীয় ধানের সাথে অন্য জাতের ধানের পরাগায়নের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে নতুন জাতের ধান। এবারই প্রথম বোরো মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে এই ধান চাষ করা হয়েছে। আর এ ধানের পাকা সোনালি বর্ণের লম্বা শীষে হাসছেন কৃষক। আর কয়েকদিন পরেই কাটা হবে এ ধান। ধানের শীষে ৭০ ভাগ ধান পেকে সোনালি রঙ ধারণ করেছে। কৃষকরা বলছেন, দেশে উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের ধান থেকে তোহামনি ধান ফলনে কম নয় বরং বেশি হবে। তাদের ধারণা, শতকে এক মনের কিছুটা বেশি ফলন হবে।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ইমদাদুল হক ইন্তা নামের এক কৃষক বিজাতীয় ধানের সাথে অন্য জাতের ধানের পরাগায়নের মাধ্যমে নতুন জাতের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। গেল বছর আমন মৌসুমে এ ধান চাষ করে আশাতীত ফলন পান। ফলে তার নতুন জাতের এ ধান এলাকায় কৃষকদের মধ্যে হইচইফেলে দেয়। চলতি ইরি মৌসুমে এলাকার কৃষকরা প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে এ ধান চাষ করেছেন। তার সংরক্ষিত নতুন জাতের এ ধানের নাম দিয়েছেন তোহামনি। এর ফলন দেশে চাষ হওয়া অন্য জাতের থেকে বেশি বলেও দাবি এই কৃষকের।
গেল বছর আমন মৌসুমে তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করেন। এছাড়া একই এলাকার আরো দুই কৃষক তার কাছ থেকে বীজ নিয়ে দেড় বিঘা জমিতে এ নতুন জাতের ধান চাষ করেন। এর আগে ইরি বোরো মৌসুমে নয় শতক জমিতে তোহামনি ধানের চাষ করে দশ মণ সাত কেজি ধান পেয়েছিলেন। সেখান থেকে এক মণ ধানের বীজ রেখে বাকি ধান চাল করে খাচ্ছেন। তার উৎপাদিত তোহামনি ধানের বীজ বিক্রি হচ্ছে কেজি ২০০ টাকা করে।
ইমদাদুল হক কালীগঞ্জ উপজেলার মেগুরখিদ্দা গ্রামের মৃত আবুল হোসেন মণ্ডলের ছেলে। কৃষক ইমদাদুল হক আগে পেশায় সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী ছিলেন।
ইমদাদুলের সাথে কথা বলে আরো জানা যায়, এবছর ১০৭ শতক জমিতে ধান চাষ করেছেন। এরমধ্যে ৪০ শতকের একটি জমিতে ধানের গোছ রয়েছে ৩০ হাজার। প্রতি গোছ থেকে তিনি ধানের ফলন আশা করছেন ৫০ গ্রাম। সেই হিসেবে ৪০ শতকে ৩৭ থেকে ৩৮ মণ ধান ফলন হবে বলে আশা করছেন।
ইমদাদুলের ধানের আকার মাঝারি চিকন। আমন মৌসুমে একটি ধানের শীষে ৪২০ থেকে ৪৫০টি ধান হয়। বোরো মৌসুমে একটি ধানের শীষে ৩৫০ থেকে ৪০০টি ধান হয়। এরমধ্যে ৬০ থেকে ৮০টি ধান অপুষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু দেশে চাষ হওয়া অন্য জাতের ধানে ২৫০ থেকে ৩০০টি ধান থাকে। এছাড়া তোহামনি ধান গাছের উচ্চতা মৌসুম ভেদে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার ফুট উচু হয়ে থাকে। বোরো মৌমুমে এই ধানের জীবনকাল ১৫০ দিন এবং আমন মৌসুমে ১২০ থেকে ১৩০ দিন।
কৃষক ইমদাদুলের দাবি, তিনি পরাগায়নের মাধ্যমে বিজাতীয় ধান থেকে নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, নিয়ম না মেনে কৃষক পর্যায়ে পরাগায়নের মাধ্যমে ধানের জাত পরিবর্তন একেবারেই অসম্ভব। ধানের জাত উন্নয়ন করতে হলে বৈজ্ঞানিক কিছু প্রক্রিয়া আছে, যা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হয়।
কৃষক ইমদাদুল হক বলেন, ‘২০১৫ সালের কথা। আমার ধানের ক্ষেতে বিজাতীয় একটি ধানগাছ থেকে ছয়টি ধানের শীষ সংগ্রহ করি। পরে সুবললতা ধানের সাথে ৪০ গোছ ধানের চারা রোপণ করে পরাগায়নের পর আবার সংগ্রহ করি। পরের বছর বাসমতি ধানের আবার ৪০ গোছ ধানের চারা রোপণ করে সংগ্রহ করেন। এরপরের মৌসুমে এক গন্ডা জমিতে এই ধানের চারা রোপণ করে বীজ সংগ্রহ করি। ২০১৯ সালে বোরো মৌসুমে নয় শতক জমিতে ধান রোপণ করেন। এই জমিতে দশ মণ সাত কেজি ধান পাই। ২০২০ সালে আমন মৌসুমে সেই বীজ থেকে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে চাষ করি। মাঠে চাষ হওয়া অন্য ধানের থেকে আমার ধানের শীষ বড় এবং ধানও বেশি। সবার আগে পাক ধরে। আশা করি, ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে ৩০ মণ ধানের বেশি হবে।’
গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আক্তারুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর ধরে ইমদাদুল হক এই ধান নিয়ে কাজ করছেন। এলাকার অনেকে তাকে ‘ধান গবেষক’ বলে হাসিঠাট্টা করেন, কেউ আবার পাগলও বলেন। কিন্তু গেল বোরো ও আমন মৌসুমে তার ধান দেখে সবাই অবাক। এখন সবাই তার ধানবীজ নেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস অফিসার শিকদার মো. মোহায়মেন আক্তার বলেন, ‘আমি সংবাদ পেয়ে তার ধানক্ষেত দেখতে গিয়েছিলাম। জমিতে নিয়ম মেনে চারা রোপণ বা সার-কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়নি। তারপরও তার ধান চাষ সন্তোষজনক। ধানের শীষে যে পরিমাণ ধান রয়েছে তাতে ফলনও সন্তোষজনক হবে বলে মনে করছি। কিন্তু জাত উন্নয়নের দাবি নিয়ে কিছু বলতে পারবো না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা আছেন, নিয়ম মেনে চাষ করছে তারা পরবর্তী মৌসুমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলতে পারবেন জাত উন্নয়ন হয়েছে কিনা বা আদৌ জাত উন্নয়ন সম্ভব কিনা। তবে তার চাষে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সব সময় খোঁজখবর রাখছি এবং আর্থিক ও প্রযুক্তিসহ সার্বিক সহযোগিতা করছি।’




