আকরামুজ্জামান ॥ মৎস্যপল্লী খ্যাত যশোরের চাঁচড়ায় মাছ চাষি ও ব্যবসায়ীদের বহুদিনের দাবির প্রেক্ষিতে মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও ব্যবহার হচ্ছে না। প্রায় দেড় বছর আগে নির্মাণ কাজ শেষ হলেও হস্তান্তর করা হয়নি মৎস্যজীবীদের কাছে। কবে নাগাদ তা সম্ভব হবে বলতে পারছে না স্থানীয় মৎস্য অধিদপ্তর।
মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে মাছের যে পরিমাণ রেণু-পোনা উৎপাদন হয় তার ৬০ ভাগ উৎপাদন হয় যশোরের চাঁচড়ার হ্যাচারি ও নার্সারিগুলোতে। বছরে উৎপাদন হয় প্রায় ৬৮ হাজার কেজি রেণু। মাছের এই পোনা বিক্রির নির্ধারিত কোন বাজার না থাকায় রাস্তার পাশে খোলা স্থানে মাছ চাষীদের রেণু বা পোনা বিক্রি করতে হয়। এ কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। এজন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন একটি বিশেষায়িত সরকারি মাছ বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণের জন্য।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানাগেছে, ২০১৯ সালের প্রথম দিকে পোনার বাজার চাঁচড়া এলাকায় প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মৎস্য অধিদপ্তর আধুনিক মানের পোনা বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ শুরু করে। একই বছরের ডিসেম্বরে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। দ্বিতল ভবনের এ কেন্দ্রের উপর তলায় ৭০ জন মাছ চাষি দেশীয় জাতীয় মাছের পোনা ও রেনু বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে এবং নিচতলায় ৫০ চাষি কার্প জাতীয় মাছের পোনা ও রেনু বিক্রি করতে পারবেন।
যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ ফিরোজ খান বলেন, মৎস্যজীবীদের সুবিধার্থে নির্মিত এ কেন্দ্রটি কোন অদৃশ্য কারণে ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে না তা আমরা জানিনা। তবে বিক্রয় কেন্দ্রটি চালু হলে যশোরসহ দািক্ষণাঞ্চলের মাছ চাষী ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে কিন্তু এর অবকাঠামোগত বিষয়ে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। বিশেষ করে জায়গা সংকুলানের কারণে এখানে সামান্য সংখ্যক ব্যবসায়ী সুবিধা পেলেও জেলার মাছ চাষিদের বড় একটি অংশ বঞ্চিত হবেন।
একই কথা বলেন, জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী ও হ্যাচারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার। তিনি বলেন, বিপুল অংকের টাকায় নির্মিত এ প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলের মাছ চাষিদের কোনো সুফল আসবেনা। কেন্দ্রটিতে যে সুযোগ রয়েছে সেখানে ১০০ জন চাষিও একসাথে বসে ব্যবসা করতে পারবেন না। অথচ জেলায় এ পেশার সাথে যুক্ত প্রায় ২০ হাজার লোক রয়েছে। বিপুল সংখ্যক মাছ চাষিরা কেন্দ্রটির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।
মৎস্য চাষি অহিদুল্লাহ লুলু বলেন, কেন্দ্রটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে অফেরৎযোগ্য জামানত নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। যা একেবারেই সমীচিন হয়নি। মাছ চাষিরা যদি এখান থেকে তাদের কাঙ্খিত সুযোগ না পান তাহলে কেনো তারা এখানে অর্থ লগ্নি করবেন। যেকারণে অধিকাংশ মাছ চাষিদের মধ্যে কোনো আগ্রহ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, কেন্দ্রটি এমন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের তেমন কোনো সুযোগ নেই। যেকারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে তেমন কোনো সুবিধা পাবেন না।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরও কেন্দ্রটি কবে নাগাদ তা চালু করা সম্ভব হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। এ বিষয়ে জেলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিচুর রহমান বলেন, মূল পরিচালনার নির্দেশিকা না পাওয়ার কারণে সুফলভোগীদের কাছে হস্তান্তর করতে পারিনি। তবে লকডাউন চলে গেলে এটি মৎস্যজীবীদের মাঝে বুঝে দেয়া হবে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির পর সর্বমোট ১২০ জনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৯০ জন চাষি আবেদন করেছেন। বাকি চাষিদের জন্য আবারো বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, কেন্দ্রটিতে জেলার সব মাছ চাষিদের সুযোগ দেয়া সম্ভব নয় সত্য, তবে এটি চালু হলে এ অঞ্চলের মাছ চাষের জন্য সুযোগ আরও বাড়বে।
যশোরে বর্তমানে দেড় লাখ লোক সরাসরি মাছের রেনু ও পোনা উৎপাদনের সাথে জড়িত।




