বান্দরবানে পর্যটনবান্ধব প্রকল্পের বিরোধিতার অভিযোগ

0

কাজী সোহাগ॥ বলা হচ্ছে বান্দরবানের চন্দ্রপাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল প্রকল্পটির জমির পরিমাণ ১ হাজার একর। উচ্ছেদ হবে ১০ হাজার জনগোষ্ঠী। চারটি গ্রাম পরোক্ষভাবে উচ্ছেদের কবলে পড়বে এবং ৭০-১১৬টি পাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ হোটেল কমপ্লেক্স ঘিরে পর্যটনের যে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠবে তা ম্রোদের সোশ্যাল প্রাইভেসি, তাদের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তাদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যমণ্ডিত জীবিকা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও স্বকীয়তাকে ক্রমশ নির্মূলের পথে ঠেলে দেবে এবং ম্রোদের সেখানে টিকে থাকাটা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়রা বলছেন, আসলে এসব অপপ্রচার। রোববার সরজমিন স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। মানবজমিনকে তারা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে তৎপর দুই উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূল এসব তথ্য ছড়িয়ে পাহাড়কে অশান্ত করে তুলছে। নিজেদের আধিপত্য ও অবাধ চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখতে তারা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রকৃত তথ্য হচ্ছে- চন্দ্রপাহাড়ে যে হোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার জমির পরিমাণ ২০ একর। প্রকল্পের ৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো বসতি নেই। ওই প্রকল্পের ফলে ১০ হাজার জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ হবে বলে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে পার্শ্ববর্তী চারটি পাড়ায় ১২৪টি পরিবারের বসবাস। এতে সর্বমোট জনবল ৮১৭ জন এবং তাদের মধ্যে কারোর বাস্তুচ্যুত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। সরজমিন দেখা গেছে, চন্দ্রপাহাড়ের নিকটবর্তী পাড়াগুলোর নাম যথাক্রমে কাপ্রুপাড়া, দোলাপাড়া, কলাইপাড়া ও এরাপাড়া। চন্দ্রপাড়া উত্তর-পশ্চিমে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। ওই পাড়ায় সর্বমোট ৪৮ পরিবারের বসবাস ও মোট জনসংখ্যা ৩২০ জন। চন্দ্রপাহাড় হতে দোলাপাড়া দক্ষিণ-পূর্বে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এ পাড়ায় ২০টি পরিবারের মোট জনসংখ্যা ১২০ জন। চন্দ্রপাহাড় থেকে কলাইপাড়া পূর্বে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। ওই পাড়ায় ৩৭টি পরিবারের বসবাস এবং জনসংখ্যা ২৫০ জন। চন্দ্রপাহাড় থেকে এরাপাড়া উত্তরে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এবং পাড়ায় মোট ১৯টি পরিবার বসবাস করছেন। তাদের মোট জনসংখ্যা ১২৭ জন। ওই এলাকার ২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো বাঙালি জনবসতি নেই এবং বাঙালি একক মালিকানাধীন কোনো প্রকল্পও নেই। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ১০০০ থেকে ১৫০০ জন উপজাতি পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বান্দরবান উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত, পাহাড়ি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং পাহাড়ি জনগণের উৎপাদিত কৃষিপণ্য আগত পর্যটকদের কাছে ন্যায্যমূল্যে বিক্রয় করতে পারবে। দোকান ও রেস্তঁরা ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় উপজাতীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম উক্ত এলাকায় বেগবান হবে বিধায় নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উন্নয়ন হবে। তারা বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে পর্যটনের বিকাশ হলে স্বার্থান্বেষীদের অস্তিত্ব থাকবে না। এ কারণে দেশ-বিদেশে মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানোই তাদের মূল হাতিয়ার। বান্দরবানের চন্দ্রপাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল ম্যারিয়ট নির্মাণের বিরুদ্ধে তারা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো অব্যাহত রেখেছে। এটি নির্মাণ হলে পার্বত্যাঞ্চলের নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের পর্যটকের ভিড় বাড়বে। প্রকল্পটি বান্দরবান জেলার লামা থানাধীন জীবননগর চন্দ্র পাহাড়ে অবস্থিত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এই পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ ও পার্বত্যাঞ্চলে উন্নয়নের পক্ষে। তারা বলেন, আধুনিক যুগে থেকেও আমরা পিছিয়ে আছি দুটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কারণে। জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূল এই দুটি সংগঠন মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি করছে পার্বত্যাঞ্চলে। চাঁদাবাজি ও তাদের অস্তিত্ব টিকে না থাকার আশঙ্কায় তারা পার্বত্যাঞ্চলে উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী আরো বলেন, পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণে আমাদের কাউকে উচ্ছেদ করা হয়নি। বরং এটি নির্মিত হলে এলাকায় কর্মসংস্থান বাড়বে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এটি আকর্ষণীয় স্থান। কিন্তু পাঁচ তারকা হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টসহ নানা অবকাঠামোর অভাবে অনেক পর্যটক এখানে যেতে পারেন না। পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের জন্য বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে ২০১৫ সালে ২০ একর জমি বন্দোবস্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলে পর্যটন শিল্প বিকাশে বিরোধিতায় নেমেছে দুই সংগঠন জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূল। সেখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা হলে তাদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটবে বলে তারা অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে দিতে চায় না। এই দুই সংগঠন মাসে মোটা অঙ্কের টাকার চাঁদা আদায় করে পার্বত্যাঞ্চলে। আর এই টাকার ভাগ কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও এক শ্রেণির রাজনীতিবিদরা পান। এ কারণে জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূলের পক্ষে বিভিন্ন সময় তারা কথা বলেন, বিবৃতি দেন। এই অবস্থার অবসান ঘটানোর দাবি জানিয়ে পাহাড়ি-বাঙালিরা বলেন, আমরা শান্তি চাই, এক সঙ্গে বাঁচতে চাই। সার্বিকভাবে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হওয়ায় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে বান্দরবানের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ তৈরি হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন-বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত ও নেপালে হিমালয় পর্বতমালাকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। বর্তমান সরকার যখন পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে, ঠিক তখনই পর্যটনবান্ধব একটি প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করতে স্বার্থান্বেষী মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।