বেরোবি ভিসি কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে ১১১ অভিযোগের শ্বেতপত্র প্রকাশ

লোকসমাজ ডেস্ক॥ রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে ৭৯০ পৃষ্ঠার ১১১টি অভিযোগের শ্বেতপত্র প্রকাশ করে তাকে অপসারণ ও অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলেছে শিক্ষকদের সংগঠন- অধিকার সুরক্ষা পরিষদ। শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ক্যাফেটরিয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানানো হয়। তবে এসব অভিযোগ ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন, অতীতে বারংবার উচ্চারিত দুরভিসন্ধিমূলক’ বলে মন্তব্য করেছেন ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তার দাবি, রোববার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত দল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে। এর আগে ‘ভিত্তিহীন শ্বেতপত্র’ প্রকাশের উদ্দেশ্য মূলত তদন্ত টিমকে প্রভাবিত করা। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রটিকে ‘তথাকথিত শ্বেতপত্র’ হিসেবে অভিহিত করে তা প্রত্যাখান করা হয়েছে।
প্রকাশিত দুর্নীতির শ্বেতপত্রে নিয়োগবিধির শর্ত ভঙ করে ক্যাম্পাসে ধারাবাহিক অনুপস্থিতি, শিক্ষক কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনা হয় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে। একই অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে আন্দোলন করছে অধিকার সুরক্ষা পরিষদ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনটি। তাদের পক্ষ থেকে ইউজিসিতে করা ৪৫টি অভিযোগের তদন্তে রোববার ক্যাম্পাসে আসার কথা একটি তদন্ত দলের। তার আগের দিন দুপুরে সংগঠনটি ভিসির বিরুদ্ধে ৭৯০ পৃষ্ঠার দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করলো। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিষদের সদস্য সচিব খায়রুল কবির সুমন, শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. গাজী মাজহারুল আনোয়ার, ড. তুহিন ওয়াদুদ, নীল দলের সভাপতি ড. নিতাই কুমার ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মন্ডল, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি কমলেষ চন্দ্র রায় ও সাধারণ সম্পাদক মশিয়ার রহমান, অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফিরোজুল ইসলাম, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মাসুদ খান, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ইউনিয়ন সভাপতি নুর আলম, সাধারণ সম্পাদক রশিদুল ইসলাম প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হক। সংবাদ সম্মেলনে ভিসির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ১৪ জুন যোগদানের পর থেকে অনুপস্থিতি, একাডেমিক ও প্রশাসনিক আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি, ভর্তিবাণিজ্য, হয়রানি, নির্যাতন, নিপীড়ন ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার মদদে তিনি এসব দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালের প্রোভিসি ড. আবুল কাশেম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবের হোসেন চৌধুরী, সুচিত্রা শারমিন ও ভিসির ঘনিষ্ঠ তানভীর আবির প্রশিক্ষণ ও মিটিংয়ের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. হাসিবুর রশীদও এসব অনিয়মে যুক্ত রয়েছেন। আইন অমান্য করে তিনি ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ নিয়েছেন। অভিযোগে আরো বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে ভিসি ও তার মা দু’জনে মিলে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ভিসি নিজেই। ভিসি হিসেবে নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি, অনুষদের ডিন হিসেবে তিনি নিয়োগ বোর্ডের সদস্য। আর বিভাগের প্রধান হিসেবেও তিনি সদস্য। অপর দিকে তার মা বিশেষজ্ঞ সদস্য। এ ছাড়াও আবুল কাশেম মজুমদারকে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ বোর্ডের অন্তত ১০টি বোর্ডে সদস্য করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়নি। শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. সুচিত্রা শারমিনকে চারটি বিভাগে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য করা হয়েছে। ভিসির পিএস আমিনুর রহমানের ভায়রা ভাই মাহমুদুল হককে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এক বছর না যেতেই সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাকে।
অভিযোগে বলা হয়, ভিসি তার ব্যক্তিগত সহকারী ভর্তি জালিয়াতির অপরাধে সিন্ডিকেটে সাজাপ্রাপ্ত আবুল কালামের স্ত্রী নুর নাহার বেগমকে সেমিনার সহকারী, মামাতো ভাই গোলাপ মিয়া, বন্ধুর ছোট ভাই হযরত আলীকে এমএলএসএস পদে ও ফুফাতো ভাই কাওসার হোসেনকে সেমিনার সহকারী পদে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছেন। আর্থিক দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি নীতি অনুসরণ না করে অনিয়ম-দুর্নীতি করা হয়েছে। পরিবহন পুলের সাথে সংযোগ সড়ক নামে ইট বিছানো রাস্তা নির্মাণ দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। ইউজিসির বরাদ্দকৃত ৩৫ লাখ টাকার কাজকে ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। যেখানে রাস্তা নির্মাণের কাজ করেছে মেসার্স ফল ভান্ডার নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়াও ভিসির আদালত অবমাননা, ঢাকাস্থ লিয়াজোঁ অফিসে অনিয়ম, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণে অনিয়ম, ধারাবাহিক অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির কথা তুলে ধরা হয় শ্বেতপত্রে। সংবাদ সম্মেলনের মূল কপিতে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো কথা না থাকার বিষয়ে সাংবাদিকেদের প্রশ্নের সময় কিছুটা এলোমেলো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় সাংবাদিকদের কোনো উত্তর না দিয়ে ভিসিকে অপসারণ ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান সংগঠনটির নেতারা। এ ছাড়াও দুর্নীতির প্রথম খণ্ড প্রকাশ করা হয়েছে উল্লেখ করে আরো খণ্ড প্রকাশ করা হবে বলে জানান তারা।
যা বলছেন ভিসি ড. কলিমউল্লাহ
তবে অধিকার সুরক্ষা পরিষদের এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করছেন ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, অধিকার সুরক্ষার নামে যে গোষ্ঠীটির কয়েকজন একত্রিত হয়েছেন। তারা হাতে গোনা ও চেনা মুখ। তারা আমার আগের ভিসি প্রফেসর ড. নুর উন নবীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তারা তার আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহী ও তার বেনিফিসিয়ারি। তার সময়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির ধারক-বাহক তারা। যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি আরো বলেন, এটা তাদের রাজনীতি। যেহেতু রোববার ইউজিসি থেকে একটি তদন্ত দল ক্যাম্পাসে আসবে, এ কারণে তাদেরকে প্রভাবিত করার চিন্তা থেকেই এক দিন আগে বারবার প্রচারিত ও উচ্চারিত এ ধরনের অসত্য বক্তব্যগুলো ফলাও করে প্রচার করার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টি পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুরভিসন্ধিমূলক। এর কোনো ভিত্তি নেই। এ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের সহকারী পরিচালক এহতেরামুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অধিকার সুরক্ষা পরিষদের শ্বেতপত্র বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার জন্য মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাজানো। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ ও শিক্ষা, গবেষণা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করতেই এসব করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভিসিসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ৪৫টি অভিযোগ এনে শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদ। সেই বিষয়ে গঠিত ইউজিসির তদন্ত কমিটি রোববার আসবে ক্যাম্পাসে। এরই মধ্যে নির্মাণাধীন হল ও ইনস্টিটিউটে ভিসির বিরুদ্ধে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দে অনিয়মের প্রতিবেদন নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

ভাগ