ভীতিপ্রদ আইনটি প্রত্যাহার করতে হবে

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক নাগরিক সমাবেশে লিখিত বক্তব্যে তিনি এ দাবি জানান। সমাবেশে তার বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। ব্যক্তিগত কারণে যোগদান করতে না পেরে তিনি লিখিত বক্তব্য পাঠান। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যখন চালু করা হয় তখন সরকার ও তার সমর্থক ছাড়া সকল মহল থেকেই শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, এর অপপ্রয়োগ ঘটবে। মতপ্রকাশের অধিকার আরো ক্ষুণ্ন হবে। হয়তো কণ্ঠরোধের ঘটনাই ঘটবে। প্রতিবাদ করা হয়েছিল।
কাজ হয়নি। দেখা গেল আশঙ্কাটা মিথ্যা ছিল না। ইচ্ছামতো মামলা দেয়া হচ্ছে। মানুষ গ্রেপ্তার হচ্ছে, নাজেহাল হচ্ছে। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলতো গুমই হয়ে গিয়েছিলেন। সীমান্ত এলাকায় যখন দেখা গেল তাকে, তখন অসুস্থ মানুষটিকে ধরে এনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হলো। জামিনের চেষ্টা হলো- কিন্তু কাজ হলো না। শেষে দেশ বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে যখন প্রতিবাদ হলো, লেখালেখি হলো তখন কোনো মতে জামিন পেলেন। মুশতাক আহমেদ তো তা-ও পেলেন না। ছয় বার জামিনের আবেদন করেছেন, গ্রাহ্য হয়নি, সপ্তমবার আর করার প্রয়োজন হলো না, তিনি চিরমুক্ত হয়ে চলে গেলেন। এভাবেই বিরুদ্ধ মত আর পথ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ডিজিটাল আইন।
বললে কি অন্যায় হবে যে মুশতাক হচ্ছেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের প্রথম শহীদ? ঘটনাটা সেরকমই নয়কি? আশা করবো- এটাই শেষ ঘটনা। ভরসা হচ্ছে প্রতিবাদ। মুশতাক আহমেদ একজন লেখক, তিনি একজন উদ্যোক্তাও। তিনি কারও কোনো ক্ষতি করেননি। ফৌজদারি বা দেওয়ানি কোনো অপরাধে অপরাধী নন। দেশের সম্পদ পাচার করেননি, কাউকে গুম করেননি। বলা হচ্ছে তিনি রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর লেখা লিখেছিলেন। রাষ্ট্র কি এতই দুর্বল যে একজন লেখকের সামান্য কিছু লেখার জন্য বিব্রতবোধ করবে? সরকার কী নিজের জনসমর্থন বিষয়ে এতটাই আশাহীন, যে মনে করবে ওই লেখাতে তার ভাবমূর্তির ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেছে। সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য তো নাগরিকদের চিন্তার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিরাপত্তা দেয়া। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তো সেটাই। পাকিস্তান আমলে আমরা দুঃসহ এক নব্য ঔপনিবেশিক জুলুমের মধ্যে ছিলাম। সেকালেও শুনিনি যে লেখার জন্য কোনো লেখককে আটক করা হয়েছে এবং হেফাজতে তার মৃত্যু ঘটেছে। লেখার জন্য ধরে এনে জেলে এবং বন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটতে দেয়া- দুটোই ভয়ঙ্কর অন্যায়। সেটা কোনোমতে মেনে নেয়া যায় না, মেনে নেয়া উচিতও নয়। এতে করে দেশে এবং বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রের ও সরকারের ভাবমূর্তি যে উজ্জ্বল হবে- এমন আশা নিতান্ত দূরাশা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অবিলম্বে বাতিল করা দরকার। মুশতাক আহমেদের প্রাণত্যাগের ঘটনায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার তো আমরা চাইবোই, সেই সঙ্গে ভীতিপ্রদ আইনটির প্রত্যাহারও চাইবো অবিলম্বে। ডিজিটাল অপরাধের জন্য প্রচলিত ফৌজদারি আইন যথেষ্ট। প্রয়োজনে তার সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। চিন্তার স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করা গণতন্ত্রের ওপর এবং মনুষত্বের ওপর আঘাত। আমরা আমাদের মনুষত্বকে রক্ষা করতে চাই। আর জন্যই দীর্ঘকাল ধরে আমরা লড়ছি।

ভাগ