সেক্টর কমান্ডারের ‘বীর উত্তম’ খেতাব

তৈমূর আলম খন্দকার
সেনাপ্রধানের পরিবারকে কেন্দ্র করে আল-জাজিরায় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর বর্তমানে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হলো জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব নিয়ে নেয়ার জন্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল কর্তৃক সুপারিশ। এ পরিপ্রেক্ষিতে চলছে নানাবিধ আলোচনা-সমালোচনা। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন জনগণকে এ মর্মে বুঝাতে যে, খেতাবটি ছিনিয়ে নেয়া বা বাতিল করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ হিসেবে শাসক দল বলে যে, জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত এবং তার প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। পক্ষান্তরে যে সব দল বা নেতা বিএনপিকে সমর্থন করেন না তারাও এহেন বক্তব্যের সমালোচনা করছেন। আওয়ামী ঘরানা থেকে যার সৃষ্টি, একমাত্র নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব (মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম) যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণের নিমিত্তে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং একই উদ্দেশ্যে যাকে সেখানে দীর্ঘদিন থাকতে হয়েছে, তিনি নিজেও জাতীয় দৈনিকে লিখে জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাবকে ছিনিয়ে নেয়ার প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সীমালঙ্ঘন এবং নৈতিকতাবিরোধী। চারটি রাজনৈতিক দলের নেতা প্রেস কনফারেন্স করে জিয়ার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রত্যাহার করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বলেছেন, যদি কোনো দিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয় তাহলে তাদের প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান তারাই ছিনিয়ে নেয়া একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আওয়ামী লীগ হয়তো মনে করতে পারে, তারা কোনো দিন ক্ষমতাচ্যুত হবে না। যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের মনে এ ধরনের ধারণা সবসময়ই থাকে এবং মনে মনে আশা পোষণ করে যে, তারা কোনো দিনই ক্ষমতাচ্যুত হবে না এবং তাদের রমরমা অবস্থা সবসময়ই একরকম থাকবে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো ক্ষমতা ও রাজত্ব কোনোদিনই চিরস্থায়ী হয়নি; বরং ক্ষমতায় আগমন যতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যের হয়েছে বিদায়টি হয়েছে নিদারুণ বেদনাদায়ক। ইতিহাস সবাই জানেন। ইতিহাস জানার পরও ক্ষমতাসীনরা শিক্ষা নেন না, এটাই ইতিহাসের ইতিহাস।
বর্তমান সরকার ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’কে অনেক মূল্যায়ন করে বলে তাদের ধারণা। তারা কথায় কথায় বলে থাকেন, এটা করা যাবে না এবং ওটা করা যাবে না। এর পেছনে যুক্তি থাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী হওয়া। অথচ জিয়াউর রহমানের প্রধান পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, যার কণ্ঠে ডব জবাড়ষঃ বলে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঘোষণা মানুষ শুনেছিল এবং এ কথাটি আওয়ামী লীগের অনেক মুক্তিযোদ্ধা তাদের লিখিত বইয়ে প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, এ কথা মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে। দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। জিয়াউর রহমানকে নিয়ে এ সরকার তখনো কোনো কাহিনী রচনা করেনি। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত ছিলেন বলে সাম্প্রতিককালে ক্ষমতাসীন দলের বক্তব্যের সাথে তাদের পূর্বাপর বক্তব্যের মিল নেই। ফলে এটাই বলা যায় যে, জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যামামলায় জড়িত করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলটি আজ ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় নেই। তারপরও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি এবং স্বয়ং সরকারপ্রধান তাদের বক্তব্যে অপ্রাসঙ্গিকভাবে হলেও বিএনপিকে টেনে এনে দলটির বিরুদ্ধে বলে থাকেন। সরকারি দলের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা প্রদান, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা।
সাংবিধানিকভাবে একজন নাগরিক যে মৌলিক অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার প্রাপ্য তা যেন ক্ষুণ্ন না হয় এর নিরাপত্তা দেয়াই রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, গদিকে পাকাপোক্ত করার জন্য বিএনপির সমালোচনাসহ বিষোদ্গার করা হচ্ছে। সর্বশেষ এখন বলা হচ্ছে, ১৫ আগস্টের ঘটনার পেছনে জিয়ার হাত রয়েছে! প্রচারটি প্রতিষ্ঠিত করে বীর উত্তম খেতাব কেড়ে নেয়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে জনগণের সামনে জিয়াকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা এটি। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারি ঘরানারই দ্বিমত প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি ঘরানার এক বুদ্ধিজীবী যা বলেন তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো- ‘জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেছেন এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল। তিনি বলেন, কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে পরে কোনো অন্যায় করবেন না, তা-ও ভাবা যাবে না। তবে তার খেতাব কেড়ে নেয়ার কথা বলার আগে সরকারের মন্ত্রীদের উচিত ছিল এটা প্রমাণ করা যে, বঙ্গবন্ধুর খুনের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। এটা মুখে বললেই হবে না, প্রমাণ করতে হবে। আর প্রমাণ ছাড়া খেতাব কেড়ে নেয়ার কথা বললে শুধু বিভ্রান্তিই সৃষ্টি হবে। এ জন্য কমিশন গঠন করে তদন্ত হওয়া দরকার ছিল বলেও মনে করেন তিনি। (জাতীয় দৈনিক, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১)
বিশিষ্ট কলামিস্ট মাসুদ মজুমদার ‘খেতাব বিতর্ক’ শিরোনামে (২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত) একটি নিবন্ধে লিখেন যে, ‘খেতাব বিতর্ক অনর্থক। এটি এক ধরনের কুতর্ক; রাজনীতিতে সুড়সুড়ি দেয়ার মতো বিষয়, এতে কোনো লাভ হবে না। বরং রাজনীতিকে নতুন করে মেরুবদ্ধ করবে। জিয়াভক্তরা আরো ঐক্যবদ্ধ হবেন। এ ঘটনার অন্য একটি দিকও আছে, জিয়ার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলে একসময় বঙ্গবন্ধুর সব স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার একটা মওকা তৈরি হবে যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’ প্রবাদ শুনেছি যে, ‘ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সব কিছুই পারে। শুধু একজন নারীকে পুরুষ এবং পুরুষকে নারী বানানো ব্যতীত।’ ওই মতবাদ এখন অকার্যকর। কারণ বাংলাদেশ সরকার এখনই সবই পারে। দেশের পার্লামেন্ট, আইন-আদালত, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বুদ্ধিজীবী এবং দেশের জনগণের বিবেক এখন সম্পূর্ণভাবে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। তারপরও কিছু মানুষ রয়েছে যারা বিবেকবর্জিত নয় বিধায়ই সরকারের স্বেচ্ছাচারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলে, যা বলে তা শুধু বিবেকের তাগিদেই বলে। সরকার জোর গলায়ই বলে যে, তারা গণতান্ত্রিক সরকার এবং গণতন্ত্রের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। এটা মুখের কথা বটে। গণতন্ত্রের পাশাপাশি সরকার ‘ভয়তন্ত্র’ বাংলাদেশে গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে গেছে। জিয়াউর রহমানের নামে যা যা প্রতিষ্ঠান ছিল প্রায় সবগুলোর নামই পরিবর্তন করে দিয়েছে। এমনকি গ্রাম পর্যায়ে কারো বাড়িতে যদি জিয়ার ছবি থাকে সেখানেও হামলা ও ভাঙচুর করে।
নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন তারাবো পৌরসভার যাত্রামুড়া গ্রামের নিবাসী, নারায়ণগঞ্জ জেলা ওলামা দলের সভাপতি শামছুর রহমান বেনু খানের বাড়িতে সরকারি দল প্রায়ই হামলা চালিয়ে জিয়াউর রহমানের ছবি ভাঙচুর করে। এভাবে কয়েকবার তার বাড়িতে হামলা হয়েছে, হামলার বিরুদ্ধে থানায় মামলা নেয় না; ভাঙচুরকারীদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, ‘মন্ত্রীর নির্দেশে করেছি’। সে বাড়িতে অনুরূপ ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এলাকায় বিএনপির কোনো ঘরোয়া সভা হলেও হামলা-মামলা শুরু হয়ে যায়। দেশে বর্তমানে ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে। তবে সরকারি দলের উচ্ছৃঙ্খলতা এখন তাদের নিজ দলেও বিরাজমান। এখন প্রায়ই এ দলের মিটিংয়ে নিজেরা মারামারি করে সভা পণ্ড করে দেয়া হয়। এটা মন্ত্রীদের উপস্থিতিতেও হচ্ছে। মানুষ এখন ভয়ে কথা বলে না, প্রতিবাদও করতে চায় না। কারণ প্রতিবাদ করবে কোথায়? সে জায়গাটুকু আর নেই। বিচার দেবে কোথায়? সবই তো এখন সরকারের কঠিন নিয়ন্ত্রণে। চলছে শুধু ‘জি হুজুর, জাঁহাপনার’ সংস্কৃতি। কথায় বলে, ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’। সরকার হয়তো মনে করছে, তাদের ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। সরকারের মতে, তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান। উন্নয়ন সব সরকার আমলেই হয়েছে। যেহেতু বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় সেহেতু তাদের কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতি বেড়েই চলেছে। এখন বিশ্বে যা উন্নয়ন তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই হচ্ছে। তারপরও যেকোনো সরকারের নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে তারা জনসমর্থন হারিয়েছে। অনেক রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের গড়া বাহিনীর মাধ্যমে ‘ভয়তন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণকে শাসন-শোষণ করেছেন, গণতন্ত্রের নামে চালিয়েছেন রাজতন্ত্র, বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না।
স্মরণ করা যেতে পারে, ১৫ আগস্ট-১৯৭৫ সালের ঘটনার সময় জেনারেল সফিউল্লাহ ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান। জেনারেল সাহেবকে আওয়ামী লীগ এমপি বানিয়েছে এবং বর্তমানে তিনি এ দলের উপদেষ্টা। ‘বীর উত্তম’ খেতাবটি জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া বা বাতিল করা হলে সরকার লাভবান হবে বলে মনে হয় না। তবে অতিভক্তরা ভিন্নমত হয়তো পোষণ করতে পারেন। কারণ তারা সর্বাবস্থায়ই এগিয়ে থাকেন। রাজা যা বলেন সভাসদ বলে এর বহুগুণ, এ কথাটি মিথ্যা নয়। সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে জাসদ। বীর উত্তম পদ ছিনিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করেছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান এমপি যিনি নিজেও এককালে জাসদের বড় মাপের নেতা ছিলেন।
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
taimuralamkhandaker@gmail.com
ভাগ