শর্টকোডে কলরেট কমাতে চায় সরকার, আপত্তি মোবাইল অপারেটরদের

লোকসমাজ ডেস্ক॥ কোনও অভিযোগ জানানো বা সেবা পাওয়ার জন্য ব্যাংকে বা অন্যকোনও প্রতিষ্ঠানের ৫ সংখ্যার শর্টকোড নম্বরে ফোন করে গ্রাহককেই খরচ গুনতে হয়। ফোন করলে অন্যপ্রান্ত থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলতে থাকে ‘বাংলায় শোনার জন্য ১ চাপুন, ইংরেজিতে শোনার জন্য ২ চাপুন… কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ৬ চাপুন’ ইত্যাদি। যখন কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে পাওয়া যায় বা সেবা পাওয়া শেষ হয় ততক্ষণে মোবাইলের ফোনের খরচ (চার্জ) পারদ ওপরের দিকে উঠতে থাকে। সরকার গ্রাহকের শর্টকোডে কথা বলার এই খরচ কমাতে চায় অথচ মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর এই চার্জ কমাতে প্রবল আপত্তি। অপারেটরগুলোর আপত্তির কারণেই কমছে না শর্টকোডে কথা বলার খরচ। মোবাইল অপারেটরগুলোর আপত্তির জায়গা, শর্টকোডে কথা বলার চার্জ কমালে তাদের রাজস্ব আয়ে প্রভাব পড়বে। যদিও সরকারি সংস্থার শর্টকোড নম্বরগুলোতে ফোন করার খরচ অনেক কম। বেসরকারি সংস্থার শর্টকোড নম্বরে ফোন করে সেবা পেতে চাইলে খরচ পড়বে প্রতি মিনিট ২ টাকা (ভ্যাট ছাড়া)। অন্যদিকে সরকারি সংস্থার শর্টকোডে ফোন করার খরচ মিনিট প্রতি ৪৫ পয়সা (ভ্যাট ছাড়া)।
জানা যায়, বিটিআরসি এখনও পর্যন্ত ৩৪২টি বেসরকারি সংস্থাকে কল সেন্টার সেবাদানের জন্য শর্টকোড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিটিআরসি বলছে, এসব বেসরকারি সংস্থাগুলো নিজস্ব কল সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, জরুরি সেবাসহ প্রাত্যহিক জীবনের সেবাসহ দেশের জনসাধারণের সার্বিক প্রয়োজনে প্রদান করছে। তবে তাদের কলচার্জ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সাধারণ জনগোষ্ঠী তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি কল সেন্টারের জন্য গৃহীত শর্টকোড চার্জ প্রতি মিনিট গড়ে ২ টাকা করে করে গ্রহণ করে। এই ২ টাকার মধ্যে মোবাইল ফোন অপারেটররা নেয় ১ টাকা ৮৬ পয়সা, আইপি-টিএসপি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নেয় ১০ পয়সা এবং আইসিএক্স (ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ) পায় ৪ পয়সা। শর্টকোডের কলচার্জ বেশি মর্মে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ২২৯তম কমিশন বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বেসরকারি সংস্থার জন্য বরাদ্দ করা শর্টকোডের কল সেন্টার সার্ভিসের সর্বনিম্ন ভয়েস ট্যারিফ নির্ধারণের বিষয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী কমিশন সভায় বিষয়টি আবারও উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে কমিশনের ২৩২তম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশের জনগণ যাতে সহজেই বেসরকারি কল সেন্টার সেবা পেতে পারে সেজন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত শর্টকোডের কল সেন্টার সার্ভিসের ভয়েস ট্যারিফ সর্বোচ্চ ১ টাকা নির্ধারণ করা হলো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কল চার্জ ১ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানায় মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটব। এ সম্পর্কিত কোনও ট্যারিফ নির্ধারণের আগে সব মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে আলাপ আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে একটি ঐকমত্যে উপনীত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কমিশনে আবেদন জানায় অ্যামটব। ওই চিঠি অনুযায়ী গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কমিশনের সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিস (এসএস) বিভাগের পরিচালকের নেতৃত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কল সেন্টার সার্ভিসের ট্যারিফের ভয়েস ট্যারিফ (কল চার্জ) সর্বোচ্চ ১ টাকা নির্ধারণ বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে মোবাইল অপারেটররা আপাতত তাদের ব্যবসায়িক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে বেসরকারি সংস্থার জন্য বরাদ্দ করা শর্টকোডের কল সেন্টার সার্ভিসের ট্যারিফ আগের মতো ২ টাকা মিনিট বজায় রাখার অনুরোধ করেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, এ মুহূর্তে বেসরকারি সংস্থার কল সেন্টার সার্ভিসের ভয়েস ট্যারিফ কমালে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের রাজস্বের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সূত্র আরও জানায়, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সার্বিক আলাপ আলোচনা শেষে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত কমিশনের ২৪৩তম বৈঠকে সরকারি ও বেসরকারি কল সেন্টারের সার্ভিস ট্যারিফ নির্ধারণ সম্পর্কিত বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে পরবর্তী কমিশন বৈঠকে আগের সিদ্ধান্ত (কল চার্জ ১ টাকা) পুনরায় পর্যালোচনা করে পরবর্তী কমিশন সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। জানা যায়, এই সিদ্ধান্তের আলোকে বেসরকারি সংস্থার কল সেন্টার সার্ভিসের ভয়েস ট্যারিফ কমানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার এবং বাজার পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়, এটি ভয়েস বেজড সার্ভিস হওয়ায় অপারেটররা ডিরেক্টিভ অন সার্ভিস অ্যান্ড ট্যারিফ-২০১৫ (সংশোধিত ট্যারিফ-২০১৮) অনুযায়ী কল রেট সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা প্রতি মিনিট এবং সর্বোচ্চ ২ টাকা প্রতি মিনিটের মধ্যে মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। এছাড়া মোবাইল অপারেটরদের বক্তব্য অনুসারে তাদের ব্যয়ের বিষয়টি পর্যালোচনা করে অপারেটররা বলে প্রতি মিনিট ২ টাকার সার্ভিসটি দেওয়ার ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল কস্ট, ইন্টিগ্রেশন কস্ট, মনিটরিং কস্ট, মেনটেনেন্স কস্ট, ট্রাবলশ্যুটিং কস্ট ইত্যাদি খরচ জড়িত। বিটিআরসি অ্যামটবের আবেদন পর্যালোচনা করে জানায়, বেসরকারি সংস্থার জন্য বরাদ্দকৃত শর্টকোডের কল সেন্টার সার্ভিসের ভয়েস ট্যারিফ প্রতি মিনিট ১ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আপাতত বাস্তবায়ন না করে আগের মতো ২ টাকা প্রতি মিনিট বলবত রেখে ভবিষ্যতের বাজারের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র বলেন, আমরা কল চার্জ কমানোর চেষ্টা করছি। দেখা যাক কী হয়। তিনি জানান, বিটিআরসি এ কাজের জন্য একটা কমিটি করে দিয়েছে। কমিটি কাজ করছে। কমিটি রিপোর্ট দিলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জানা গেছে, বিটিআরসির সর্বশেষ ২৪৮তম কমিশন বৈঠকে বেসরকারি সংস্থার জন্য বরাদ্দ করা শর্টকোড মাধ্যমে খরচ কল সেন্টার সার্ভিস প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ ভয়েস ট্যারিফ নির্ধারণের জন্য বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিস (এসএস) বিভাগের মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে স্বল্প খরচে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে সংস্থাগুলোর শর্টকোডের মাধ্যমে কল সেন্টার সার্ভিস প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভয়েস ট্যারিফ (কল চার্জ) নির্ধারণ করবে। ভয়েস কল চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিটি টেকনিক্যাল কস্ট, ইন্টিগ্রেশন কস্ট, মনিটরিং কস্ট, মেনটেনেন্স কস্ট, ট্রাবলশ্যুটিং কস্ট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করবে। কমিটি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বেসরকারি কল সেন্টারের সার্ভিস ট্যারিফ (ভয়েস কল চার্জ) নির্ধারণ করে প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেবে। জানতে চাইলে কমিটির একজন সদস্য পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কমিটি কাজ শুরু করেছে। কমিটি এরইমধ্যে একটি বৈঠক করেছে। তিনি জানান, বিলের সিলিং সর্বোচ্চ ২ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা করা হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ২ টাকা করেই বিল করে থাকে। আমরা চার্জ কমানোর জন্য চেষ্টা করছি। এখন কতটা কমাতে পারি সেটাই দেখার বিষয়। তিনি আরও বলেন, ২ টাকা চার্জের সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় জড়িত আছে। সেই বিষয়গুলো মাথায় নিয়েও আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি কল সেন্টারের শর্টকোডের কলচার্জ প্রতি মিনিট ৪৫ পয়সা করা হয়েছে ২ বছর আগে। এখনও সেটাই চলছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কল সেন্টারগুলো থেকে মোবাইল অপারেটরগুলো বড় অংকের রাজস্ব আয় করে থাক। কল সেন্টারের চার্জ কমিয়ে দিলে তাদের সামগ্রিক আয়ে প্রভাব পড়বে। আয় কমে যাবে। এজন্য অপারেটররা চায় না কল সেন্টারের শর্টকোড নম্বরের চার্জ কমুক।

ভাগ