৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড ১ জনের যাবজ্জীবন

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ আলোচিত ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ হত্যা মামলার রায়ে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া, শফিউর রহমান ফারাবী নামে এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো- মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে জিয়া, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন (সাংগঠনিক নাম শাহরিয়ার), আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, আকরাম হোসেন ওরফে আবির ও মো. আরাফাত রহমান। এদের মধ্যে মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে জিয়া ও আকরাম হোসেন ওরফে আবির শুরু থেকেই পলাতক। আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশের জন্য অভিজিৎ রায়কে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছে।
অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য হলো- জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ এবং নিরুৎসাহিত করা। যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ করতে না পারে। এর আগে সকাল ১০টার দিকে ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চার আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আসামিদের হাজতখানায় রাখা হয়। বেলা ১১টা ৫২ মিনিটে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হয় আসামিদের। বেলা ১২টা ১০ মিনিটে এজলাসে আসেন বিচারক। দুই মিনিট পর বেলা ১২টা ১২ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন বিচারক।
রায়ের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, সাক্ষ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় অভিজিৎ রায় একজন বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার ছিলেন। বাংলা একাডেমির বইমেলায় বিজ্ঞানমনস্ক লেখকদের আড্ডায় অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে আক্রমণের শিকার হন তিনি। নাস্তিকতার অভিযোগ এনে নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল ইসলাম সদস্যরা অর্থাৎ এই মামলার অভিযুক্তরাসহ মূল হামলাকারীরা সাংগঠনিকভাবে অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যা করে। স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশের জন্য অভিজিৎ রায়কে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়। আদালত রায়ে বলেন, অভিজিৎ রায় হত্যার উদ্দেশে হলো, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ এবং নিরুৎসাহিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ করতে না পারে। সাজা আরোপের বিষয়ে আদালত বলেন, বাংলাদেশের জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণকে মত প্রকাশে ও স্বাধীন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার উদ্দেশে অভিযুক্ত আসামিদের অভিন্ন অভিপ্রায়ে বিজ্ঞান মনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট-বড় করে দেখার সুযোগ নেই। যেহেতু অভিযুক্ত পাঁচজন (ফারাবী ছাড়া) আনসার আল-ইসলামের সদস্য হিসেবে সাংগঠনিকভাবে অভিজিৎ রায়কে হত্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে, সেজন্য পাঁচ আসামির একই সাজা (মৃত্যুদণ্ড) প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। আদালত আরো বলেন, অভিজিৎ রায় হত্যায় অংশগ্রহণকারী অভিযুক্ত আসামিরা বেঁচে থাকলে আনসার আল-ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহিত হবে এবং বিজ্ঞান মনস্ক লেখক ও মুক্তমনা লেখকেরা স্বাধীনভাবে লিখতে এবং মতামত প্রকাশ করতে সাহস পাবে না। কাজেই উক্ত আসামিরা কোনো সহানূভূতি পেতে পারে না। সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ এর ৬ (২) (অ) ধারার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। এতে একদিকে নিহতের আত্মীয়রা শান্তি পাবে এবং মুক্তমনা লেখকরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে সাহস পাবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধে করতে অপরাধীরা ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ স্বজন ও রাষ্ট্রপক্ষের
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ট্রাইব্যুনালের এসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মো. গোলাম ছারোয়ার খান (জাকির)। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। এ মামলায় মোট ছয় আসামির মধ্যে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইবুনাল। রায়ের পর ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আব্দুল্লাহ আবু বলেন, অন্যায় করে কেউ পার পায় না। এ রায় জঙ্গিদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই। রায়ের সময় অভিজিতের পরিবারের কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে ভাই হত্যার রায়ের দিন আদালতে হাজির হওয়ার কথা থাকলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আদালতে হাজির হতে পারেননি। রায় শোনার পর অভিজিতের ছোট ভাই অনুজিৎ রায় গণমাধ্যমকে বলেন, আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট। তবে রায় দ্রুত কার্যকর করা হোক। জিয়াসহ যারা পলাতক, যারা হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক। যদি গ্রেপ্তার করা না যায়, তাহলে আবার নতুন ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাবা-মা ও বড় ভাই তিন জনকে হারিয়ে মনের অবস্থ খুৃব একটা ভালো না। আজ যদি বাবা-মা বেঁচে থাকতেন তাহলে একটু সাহস পেতাম। জীবনটা যেন কেমন হয়ে গেছে। বড় ভাইয়ের এমন ঘটনার পর থেকে অনেক ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। বাসা থেকে যখন বের হতাম, তখন মনে হতো যেন প্রাণ হাতে নিয়ে বের হচ্ছি। কখন কী ঘটনা ঘটে? বলা তো যায় না। আমি আসামিদের শাস্তি দ্রুত কার্যকরের দাবি জানাই। তবে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামি পক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম ও খায়রুল ইসলাম লিটন। তারা বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আশা করি উচ্চ আদালতে আসামিরা খালাস পাবেন।
রায়ে বিচলিত ছিল না মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিচলিত ছিল না দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা। আদালতে প্রবেশ করা থেকে রায় ঘোষণার শেষ পর্যন্ত তাদেরকে খুবই হাস্যোজ্জ্বল থাকতে দেখা গেছে। আসামিদের বেলা ১১টা ৫২ মিনিটে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। এরপর বিচারক এজলাসে আসা পর্যন্ত পুরো সময়জুড়ে আসামিদের একে অপরের সঙ্গে হাসিখুশিভাবে কথা বলতে দেখা যায়। বিচারক এজলাসে আসেন বেলা ১২টা ১০ মিনিটে। ১২টা ১২ মিনিটে বিচারক যখন রায় পড়া শুরু করেন, তখন আসামিরা শান্ত থেকে খুব মনোযোগ দিয়ে রায় পড়া শোনেন। রায় ঘোষণা শেষ হলে আসামিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকেন। আইনজীবীরা জানান, ফারাবীকে রায়ের পর কিছুটা বিমর্ষ দেখালেও বাকি তিনজন রায়ের আগে ও পরে ছিল একই রকম উৎফুল্ল। তাদেরকে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন দুই আঙ্গুুল তুলে ভি চিহ্নও দেখান।
নথি থেকে জানা যায়, ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়কে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসি এলাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে জখম করে। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে ওইদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ২৭ ফেব্রুয়ারি অভিজিতের বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অজয় রায় শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা মহানগর হাকিম সরাফুজ্জামান আনসারীর আদালতে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম। ১১ এপ্রিল ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান ছয় আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) গ্রহণ করেন। ১লা আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। মামলায় মোট সাক্ষী ছিল ৩৪ জন। এর মধ্যে আদালতে সাক্ষ্য দেন ২৮ জন।