লোকসমাজ ডেস্ক॥মহামারী বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোকে ঠেলে দিয়েছে সংকোচনের দিকে। তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম চীন। মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে এরই মধ্যে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে দেশটি। করোনা ঝড়ের মধ্য দিয়েও গত বছর দেশটির অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। দেশটির এ অর্জন ব্যাপকমাত্রায় প্রশংসিত হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির অর্থনীতির এ পুনরুদ্ধার হয়েছে ভারসাম্যহীনভাবে।
একসময় চীনের অর্থনীতি ছিল পুরোপুরি সরকারি বিনিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় খাতের শিল্পোৎপাদননির্ভর। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ভোক্তাব্যয়ের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল কম। এ চিত্র বর্তমানে পুরোপুরি বিপরীত। উপরন্তু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর তাগিদ থেকে ঋণের সহজীকরণও হয়েছে অনেক। এ উদারীকরণের ফলাফল হলো দেশটিতে এখন আকস্মিকভাবেই অনেক জোম্বি কোম্পানির (যেসব কোম্পানির ব্যবসা আছে, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নেই) বেড়ে গিয়েছে। আবার এগুলোর লাভজনক হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও অনেক কম। এর ধারাবাহিকতায় দেশটির ব্যাংকগুলোতেও এখন ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে।
চীনা অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের কাছে এ দৃশ্য এখন অনেকটাই পরিচিত হয়ে উঠেছে। করোনা-উত্তরকালে এর সঙ্গে অবতারণা হয়েছে নতুন আরেকটি দৃশ্যপটের। চীনে কভিড-১৯-এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ২৯ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক, যাদের শেকড় মূলত গ্রামাঞ্চলে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে লকডাউন ঘোষণার পর এ গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
এক হিসাবে দেখা যায়, মহামারীতে চীনের এসব অভিবাসী শ্রমিকের শুধু মজুরি বাবদ ক্ষতি হয়েছে ১০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ। এ ক্ষতি যে তারা সহসাই কাটিয়ে উঠবে, তারও কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না পর্যবেক্ষকরা।
চীনের অনুন্নত গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা এসব অভিবাসী শ্রমিকদের মজুরির অর্থের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। করোনায় এ শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়ায় গ্রামীণ এসব জনপদে এখন এক নতুন সংকটের জন্ম নিচ্ছে এবং এটি ঘটছে অন্যদের চোখের আড়ালে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সামনের দিনগুলোয় চীনের অর্থনীতিতে এ সংকটের প্রভাব পড়বে বেশ নাটকীয়ভাবে।
দেশটির জিডিপির বর্তমান হার থেকে অনেকেই মনে করছেন, অর্থনীতিতে মহামারীর প্রভাব বেশ ভালোভাবেই সামলেছে চীন। কিন্তু প্রকৃত চিত্র বলছে, গ্রামীণ জনপদের ক্রমবর্ধমান সংকট দেশটির সার্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ স্কট রোজেল ও নাতালি হেল সম্প্রতি ‘ইনভিজিবল চায়না: হাউ দি আরবান-রুরাল ডিভাইড থ্রেটেনস চায়নাস রাইজ’ শীর্ষক এক গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা যায়, চীনের গ্রামাঞ্চলের কয়েক কোটি বাসিন্দা এখন স্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ এসব জনপদে এখন আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতা ও অন্ত্রের জীবাণুসৃষ্ট নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এসব অঞ্চলের সংকটগুলোকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে মহামারী। বাইরের লোকেদের কাছে চীনের গ্রামাঞ্চলের এ ধরনের সংকটগুলো এখনো অনেকটাই অজানা। এমনকি চীনা অনেক নাগরিকেরও এ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।
মহামারীর আগেই চীনের শ্রমবাজারে এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। দেশটিতে গত কয়েক দশকে জীবন ধারণের ব্যয় ও মজুরির পরিমাণ বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় স্বল্প ও অদক্ষ শ্রমিকনির্ভর শিল্পগুলো স্থানান্তর হয়েছে ইথিওপিয়া, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো স্বল্প মজুরির দেশগুলোয়। অন্যদিকে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে উন্নতি এবং জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের কারণে চীনে অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। এ কারণে মহামারীর আগেই গ্রাম থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য উৎপাদন বা আবাসন খাতে কাজ খুঁজে পাওয়াটাও অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে মহামারী। করোনার প্রাদুর্ভাবে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে দেশটির অর্থনীতিতে কয়েক কোটি অদক্ষ শ্রমিক আদতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা, সে প্রশ্নের সমাধান করা এখন অনেক জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাইরে থেকে মনে হবে, চীনের মানবসম্পদ সংকটে ভোগার সম্ভাবনা অনেক কম। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায়ও উঠে এসেছে, দেশটির শহরাঞ্চলের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বের অন্য অনেক জায়গার চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। দেশটির কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর স্নাতক হয়ে বেরিয়ে আসছেন ৮০ লাখেরও বেশি তরুণ। এর মধ্যে অর্ধেকই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ের শিক্ষার্থী। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও উন্নত বিশ্বের আরো অনেক দেশেই বাইরে থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় উৎস চীন। সে হিসেবে দেশটির মানবসম্পদ নিয়ে সংকটে পড়ার কথা অনেকের কাছেই ধারণারও অতীত। কিন্তু এর পরেও চীনে মানবসম্পদের সংকট বাড়ছে। এবং তা ঘটছে বহির্বিশ্বের কাছে একেবারেই অদৃশ্য স্থানগুলোয়—গ্রামীণ চীনে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে সম্প্রতি নতুন এক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে বেইজিং। একই সঙ্গে দেশটির লক্ষ্য রয়েছে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট অর্থনৈতিক উৎপাদন বর্তমানের দ্বিগুণে উন্নীত করার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে চীনের যে দুটি জায়গায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন, সেগুলো হলো উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি। এ দুটি বিষয়েরই ভিত্তি হলো জনসম্পদ। সুতরাং গ্রামাঞ্চলে জনসম্পদের ঘাটতিই এ মুহূর্তে চীনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাংক এ মুহূর্তে চীনকে দেখছে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে। এ অবস্থায় বড় প্রশ্ন হলো দেশটির পক্ষে আদতেই তথাকথিত মধ্যম আয়ের ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে কিনা। অনেক দেশকেই দেখা গিয়েছে চীনের বর্তমান পর্যায়ের সমান উন্নতি অর্জনের পর আর সামনে এগোতে পারছে না। ফলে দেশগুলোর পক্ষেও আর উন্নত দেশ হয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে চীনকে মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকে নজর দিতেই হবে। গত কয়েক দশকে মধ্যম থেকে উন্নত আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে পেরেছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ। এবং দেশগুলোয় শিক্ষিত মানবসম্পদের দিক থেকে দেশগুলো ছিল বর্তমান চীনের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। চীনের মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৩০ শতাংশ হাইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে। চীনের চেয়েও গরিব অনেক দেশেই এ হার আরো বেশি।
(ফরেন পলিসি থেকে অনূদিত, পরিমার্জিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত)





