লোকসমাজ ডেস্ক॥ আলজেরিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো জ্বালানি রফতানি। কিন্তু উত্তর আফ্রিকার দেশটির জ্বালানি তেল ও গ্যাস রফতানি ক্রমেই কমছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপের দিকে যাচ্ছে যে এক দশকের মধ্যেই অপরিশোধিত তেল রফতানিকারক দেশের তকমা হারাতে পারে ওপেক সদস্যভুক্ত দেশটি। খবর ব্লুমবার্গ।
আলজেরিয়ার অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেরিফ বেলমিহুবের মতে, জ্বালাতি খাতে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনা ও নতুন বিনিয়োগের ঘাটতিই দেশটিকে আজ এ দুরবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত বেতার সংস্থাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি নিজের হতাশা ব্যক্ত করেছেন এভাবে—‘আলজেরিয়াকে কোনোভাবেই আর জ্বালানিপ্রধান দেশ বলা যাবে না।’
গতকাল বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের বেশিতে উন্নীত হয়েছে। এক বছরের মধ্যে এটাই ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ দর। কিন্তু এটাও আলজেরিয়ার জন্য অপ্রতুল। কারণ দেশটির বাজেটে ভারসাম্য আনতে হলে জ্বালানিটির যে দর থাকা দরকার, বাস্তবে রয়েছে তার অর্ধেকেরও কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, আর্থিক ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হলে ব্যারেলপ্রতি ১৩৫ ডলার দর চাই আলজেরিয়ার, যা আরব বিশ্বের অন্য যেকোনো জ্বালানি উৎপাদক দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
জেনেভাভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের জ্যেষ্ঠ ফেলো জালেল হারচাওই বলেছেন, ‘জ্বালানি খাতে আলজেরিয়ার নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় দেশটিকে রফতানি বাড়াতে হলে কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
ব্লুমবার্গের শিপ ট্র্যাকিং ডাটা অনুসারে, ২০২০ সালে আলজেরিয়ার অর্থনীতির প্রাণভোমরা দুই পণ্য অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রতিটির রফতানি ৩০ শতাংশ হারে কমেছে। এই নিম্নমুখী প্রবণতা চলতি বছরেও অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারিতে দেশটির জ্বালানি তেল রফতানি দৈনিক মাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা গত ডিসেম্বরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ কম। শুধু তা-ই নয়, অন্তত ২০১৭ সালের পরের পরিসংখ্যান ঘেঁটে এত কম রফতানি আর কখনো দেখা যায়নি।
কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বৈশ্বিক ভ্রমণ খাতে ব্যাপক ধস নামে, যার আঁচ জ্বালানি খাতেও লেগেছে। ওপেকভুক্ত অন্যান্য দেশের মতো আলজেরিয়াও গত বছর তেল উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্তে সায় দেয়। তবে বর্তমানে ওপেকের বেশির ভাগ সদস্য দেশ তাদের জন্য নির্ধারিত কোটার চেয়ে বেশি তেল উত্তোলন করলেও আলজেরিয়া তাদের কোটার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে। গত মাসে দেশটিতে তেল উত্তোলনের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও তা এখনো ২০০২ সালের পর প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
নভেল করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক উদ্ভাবনে ইতিবাচক অগ্রগতি ও চীনে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে গত বছরের নভেম্বর থেকে ফিউচার্স মার্কেটে ব্রেন্ট ক্রুডের দর ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ায় এ দরবৃদ্ধির সুফল থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হয়েছে আলজেরিয়া।
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাসের ক্ষেত্রেও সমান দুর্দশায় রয়েছে দেশটি। ২০১৯ সালে তাদের গ্যাস উত্তোলন অন্তত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। একদিকে উত্তোলন কমে গেছে, অন্যদিকে স্থানীয় চাহিদা বাড়তির দিকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আলজেরিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে। ফলে এই বর্ধিত চাহিদা মেটাতে গিয়ে দেশটিকে তাদের উত্তোলিত জ্বালানির বেশ বড় একটি অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সরবরাহ করতে হচ্ছে। ফলে দেশটির রফতানির সক্ষমতাও কমে এসেছে।





