ডায়াবেটিস সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে প্রতিবছর মৃত্যুবরণ করছে অসংখ্য মানুষ

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ইউনুছ মিয়া ও তার স্ত্রী বুলবুলি দু’জনই ডায়াবেটিসের রোগী। তাদের বয়স ৬০-এর উপরে। তাদেরকে প্রায়ই রাজধানীর শাহবাগে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে আসতে হয়। ইউনুছ মিয়া জানান, তাদের ডায়াবেটিসের মাত্রা একটু বেশি। প্রতিদিনই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ৪০ মিনিট হাঁটছেন তারা। খাওয়া-দাওয়াও আগের চেয়ে অনেক নিয়ন্ত্রণে। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তাদের। মানুষ সচেতন হলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানলে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণ রাখা কোনো ব্যাপার নয় বলে সাবেক সরকারি এই কর্মকর্তা মনে করেন। আরেক ডায়াবেটিস রোগী ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী রেবা। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে পড়েন। চার বছর আগে তার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। তা আবার উচ্চমাত্রায়। তিনি জানান, ডায়াবেটিস সম্পর্কে স্বাস্থ্য শিক্ষা অনুসরণ করে তিনি ভালো আছেন। নিয়মিত হাঁটছেন। খাওয়া-দাওয়াও করেন নিয়ন্ত্রিতভাবে। তার মা’রও উচ্চামাত্রায় ডায়াবেটিস আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শুধু ইউনুছ দম্পতি বা শিক্ষার্থী রেবাই নন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭১ লাখের বেশি লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। এমন তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) বলছে, বাংলাদেশে দিন দিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে ডায়াবেটিস এখন মহামারি হয়ে উঠছে। বছরে বাড়ছে আরো ১ লাখ রোগী। আগামী ২০ বছরে এ সংখ্যা পৌঁছবে ১ কোটি ২০ লাখে। বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে ৫৭ শতাংশ লোক জানে না যে, তার ডায়াবেটিস রোগ আছে। বছরে এই রোগে প্রায় এক লাখ লোক মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৮৩ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আর প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ ডায়াবেটিস-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা যাচ্ছেন। বাংলাদেশে যেমন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেশি, তেমনি ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হারও বেশি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ ডায়াবেটিস সংখ্যাধিক্য দেশের মধ্যে দশম ছিল। কিন্তু আরো ভয়াবহ হলো ২০৩০ ও ২০৪৫ সালে বাংলাদেশ নবম অবস্থানে থাকবে। পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে উচ্চহারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনে। বাংলাদেশসহ সব উন্নয়নশীল দেশে খুব দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে, মানুষের দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে আনুপাতিক ও কাঙ্ক্ষিত হারের চেয়ে বেশি, মানুষের দৈহিক শ্রম দিন দিন কমে যাচ্ছে, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মানসিক চাপ বেড়েছে অনেকগুণ। উন্নত দেশগুলোতে ডায়াবেটিস রোগীর হার কমলেও তবে তা খুব উল্লেখযোগ্য হারে নয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডায়াবেটিস এমন এক রোগ, স্বাস্থ্যশিক্ষাই যার প্রধান চিকিৎসা। যথাযথ স্বাস্থ্যশিক্ষা পেলে একজন ডায়াবেটিক রোগী চিকিৎসকের ওপর নির্ভর না হয়ে এ রোগ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিস এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। তবে, উন্নত বিশ্বের তুলনায় উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে ডায়াবেটিক রোগীর বৃদ্ধির হার বেশি। ডায়াবেটিস সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় প্রতিবছর মৃত্যুবরণ করছে অসংখ্য মানুষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি (ডায়াবেটিস ও হরমোন) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহাজাদা সেলিম বলেন, সবার আগে দরকার এ সম্পর্কে জাতীয় তথ্য। এ জন্য জরুরিভাবে জরিপ করা প্রয়োজন। না হলে বোঝা যাবে না কার ডায়াবেটিস আছে, কার নেই। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস সম্পর্কে স্বাস্থ্যশিক্ষা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বইয়ে যুক্ত করতে হবে। মানুষ সচেতন হলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি (ডায়াবেটিস ও হরমোন) বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। ২০৩০ সালে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে ৫০ কোটিতে। বাংলাদেশে আশির দশকে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল যেখানে মাত্র ২ শতাংশ এটি এখন শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ১০ শতাংশ ছুঁয়েছে এবং গ্রামাঞ্চলে ৮ শতাংশ। এ ছাড়াও প্রি-ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিস-এর আগের ধাপ)-এর হার আরো প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ বিএসএমএমইউ’র এন্ডোক্রাইনোলজি (ডায়াবেটিস ও হরমোন) বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আশির দশকে যেখানে মোট ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২ শতাংশ, সেখানে এখন গ্রামাঞ্চলেও ডায়াবেটিসের সামগ্রিক প্রবণতা ৮ শতাংশের মতো। এভাবে ক্রমশ ডায়াবেটিস বাড়তে থাকলে শুধু ডায়াবেটিসের কারণেই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য হবে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তাছাড়া, ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যার কারণে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়ে হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইলিউর, অন্ধ হয়ে যাওয়া, পায়ে পচন, এমনকি পা কেটে ফেলা পর্যন্ত লাগতে পারে। এত বড় বৈশ্বিক এই স্বাস্থ্য সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধে দরকার জনসচেতনতা এবং জনসম্পৃক্ততা। সময়মতো ইন্টারভেনশন (খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন), নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্ভব বলে জানান তিনি।
এদিকে, ২৮শে ফেব্রুয়ারি ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস উপলক্ষে লেখা প্রবন্ধের এক জায়গায় অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ডায়াবেটিস ও এর জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব (টাইপ-২ ডায়াবেটিস ৭০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব)। বিভিন্ন গবেষণায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধে যেসব উপায় সম্পর্কে বলা হয়েছে, তা হচ্ছে-জীবনযাপনে পরিবর্তন ও সঠিক পরিবেশ। পুষ্টিকর ও পরিমিত খাদ্য গ্রহণ। শরীর চর্চা। যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা। সবচেয়ে বড় কথা এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাবে অসংখ্য লোক অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ববরণ করা ছাড়াও অকালে মৃত্যুবরণ করছে। অনেক ডায়াবেটিস রোগীর জটিলতার কারণে পায়ে পচনশীল রোগ হতে পারে এবং এর ফলে পা কেটে ফেলার মতো অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। পরিমিত খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করতে পারলে তবেই প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগী স্বাভাবিকের মতো, সৃজনশীল কাজে সক্ষম ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবেন।

ভাগ