সুন্দরবনে চোরা শিকারী সিন্ডিকেট বেপরোয়া

মনিরুল হায়দার ইকবাল, মোংলা (বাগেরহাট)॥ সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বাঘ ও হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী নিধন কোন ক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন এলাকায় ভালো অবস্থানে নেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মায়াবি চিত্রল হরিণসহ নানা ধরনের বন্যপ্রাণী। বাঘ ও হরিণ প্রাণী দুটি এখন যেন চোরা শিকারী ও পাচারকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। বন লাগোয়া বিভিন্ন অঞ্চল ও বনের গহীনে বাঘ হরিণ নিধন অনেক বেড়েছে। সংঘবদ্ধ কয়েকটি চোরা শিকারী চক্র সুন্দরবনসহ সংলগ্ন এলাকায় তাদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বন্যপ্রাণীর মাংস, চামড়া ও অঙ্গ প্রতঙ্গ চড়া দামে বিক্রি করে চলেছে। অধিক মুনাফার আশায় হরিণের মাংসসহ চামড়া, বাঘের অঙ্গ-প্রতঙ্গ, চামড়া, হাড়, দাত,নখ পাচার এখন যেন ওপেন সিক্রেট ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকার। গত জানুয়ারি মাসে দুসপ্তাহের ব্যবধানে সুন্দরবন থেকে শিকার করা ১টি বাঘের চামড়া, ১৯টি হরিণের চামড়া, ১টি হরিণের মাথা, ১২৭ কেজি হরিণের মাংসসহ ১৪ জন চোরা শিকারী ও বন্যপ্রাণীর চামড়া পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে সুন্দরবন বিভাগ, র‌্যার, কোস্ট গার্ড ও পুলিশ সদস্যরা।
২০১৮ সালের ১ নভেম্বর বনদস্যু মুক্ত ঘোষণার পর বাঘ ও হরিণ নিধন কমে এসেছে বলে বনবিভাগ দাবি করলেও গত দুসপ্তাহে বাঘ ও হরিণের চামড়া, হরিণের মাথা ও মাংসসহ ১২ জন চোরাশিকারী ও বন্যপ্রাণীর চামড়া পাচারকারীকে গ্রেফতারে বনের গহীনে চোরা শিকারীদের ব্যাপক দৌরাত্মের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এসব ঘটনা ছাড়াও বর্তমান শীতে মৌসুমের গত তিন মাসে সুন্দরবন ও আশপাশ এলাকায় পাচার করে আনা বিপুল পরিমাণ হরিণের মাংস জব্দ ও বেশ কয়েকজন শিকারী ও পাচারকারী আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে।
বর্তমানে সুন্দরবন পাহারায় সার্বণিক আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং চালিয়েও ঠেকানো যাচ্ছেনা শিকার এবং চামড়া ও মাংস পাচার। নেপথ্যে গডফাদার থাকায় চোরা শিকারী ও বন্যপ্রাণীর চামড়া পাচারকারী সিন্ডিকেটকে থামানো যাচ্ছেনা বলে অভিমত সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা পরিবেশবাদীদের। পূর্ব সুন্দবন বিভাগ ও র‌্যার- ৮ সদস্যরা গত ১৯ জানুয়ারি রাত ৮টার দিকে সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলা উপজেলা সদরের রায়েন্দা বাস স্ট্যান্ড এলাকা থেকে ক্রেতা সেজে একটি পূর্ণ বয়স্ক বাঘের চামড়াসহ মো. গাউস ফকির (৪০) নামে পাচারকারীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার বাঘের চামড়া পাচারকারী শরণখোলা উপজেলার দণি সাউথখালী গ্রামের রশিদ ফকিরের ছেলে। বেশ কয়েক মাস আগে এই বাঘটিকে সুন্দরবন থেকে চোরা শিকারীরা হত্যা করে লবণ দিয়ে পলিথিনের বস্তায় ভরে রাখে। উদ্ধার হওয়া ৮ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা ও ৩ ফুট ১ ইঞ্চি চওড়া পূর্ণ বয়স্ক বাঘের চামড়াটি সে শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামের অহিদুল নামে এক চোরাশিকারীর কাছ থেকে পাচারের জন্য কিনে রেখেছিল বলে জানায়। বন আইনে গ্রেফতার বাঘের চামড়া পাচারকারী গাউস ফকির বর্তমানে বাগেরহাট কারাগারে আটক থাকলেও এখনো আটক হয়নি বাঘ হত্যাকারী চোরা শিকারী অহিদুল।
একইভাবে ২২ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ এলাকা থেকে শিকার করে আনা ১৯টি হরিণের চামড়াসহ দুই চোরাশিকারী ও পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে জেলা ডিবি পুলিশ। ওইদিন দিবাগত রাত পোনে ২টার দিকে শরণখোলা উপজেলার বাস স্ট্যান্ডের কাছ থেকে সুন্দরবনের চোরা শিকারী ও বন্যপ্রানী পাচারকারী চক্রের দুই সদস্য মো. ইলিয়াস হাওলাদার (৩৫) ও মো. মনিরুল ইসলাম শেখকে (৪৫) গ্রেফতার করে। এসময়ে তাদের গ্রেফতার করে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে মনিরের বাসার দোতালা ঘরের কাঠের পাটাতনের উপর হতে দুটি ব্যাগে রাখা ১৯টি হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ডিবি পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, সুন্দরবন থেকে হরিণ শিকার করে এসব চামড়া পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ করেছিল। গ্রেফতারকৃত পাচারকারী মো. ইলিয়াস হাওলাদার শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামের মো. মতিন হাওলাদারের ছেলে ও মো. মনিরুল ইসলাম শেখ শরণখোলা উপজেলার বাস স্ট্যান্ড এলাকায় বর্তমানে বসবাস করলেও সে বাগেরহাট সদরের ভদ্রপাড়া গ্রামের মো. মোশারেফ শেখের ছেলে। বন আইনে গ্রেফতার এ দুইজনও বাগেরহাট কারাগারে আটক রয়েছে।
গত ২৪ জানুয়ারি গভীর রাতে দাকোপ উপজেলার রামনগর গ্রামের ধোপাদী গেটের কাছ থেকে সাড়ে ৪ কেজি হরিণের মাংসসহ ৩ চোরা শিকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরের দিন ২৫ জানুয়ারি দিবাগত রাতে খুলনার একই উপজেলার পানখালী এলাকা থেকে সুন্দরবন থেকে শিকার করে আনা ১১ কেজি হরিণের মাংসসহ ২ শিকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত এই ৫ চোরা শিকারীরা হলো, খুলনার খানজাহান আলী থানার আটরা-পালপাড়া এলাকার খান খোলজার আহম্মদের ছেলে খান মুজিবুল সুলতান (৩৩), এই থানার মসিয়ালী এলাকার আয়নাল ফকিরের ছেলে মো. টিটু হোসেন (২৪), চট্টগ্রামের মিরসরাইরের বরাইয়া গ্রামের মুন্সি মোস্তফার ছেলে রুহুল আমনি (৫৬), রাঙ্গামাটির নানিয়াচরের ইসলামপুর গ্রামের আলী আকবর হাওলাদারের ছেলে আ. সোবহান (৬৫) ও খুলনার দাকোপ উপজেলার রামনগর গ্রামের জিতেন্দ্র নাথ রায়ের ছেলে কুমারেশ রায় (৫৫)। বন আইনে গ্রেফতার এ পাঁচজনও খুলনা কারাগারে আটক রয়েছে।
এ ছাড়া ৩০ জানুয়ারি গভীর রাতে মোংলা উপজেলার দিগরাজ বাজার সংলগ্ন এলাকায় কোস্ট গার্ড সদস্যরা অভিযান চালিয়ে একটি মাথা ও ৪৭ কেজি হরিণের মাংসসহ তিন চোরাকারবারিদের আটক করে। এসময় আটককৃতদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন ও হরিণের ভুড়ি জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় আটক ব্যক্তিরা হলো- খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মোনা সরদার (৩২), বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার বন্নি গ্রামের জাফর শেখের ছেলে জাহিদ শেখ (৩৮) ও মোংলা উপজেলার দণি কানমারি গ্রামের মোহাম্মাদ আলীর ছেলে মো. শহিদুল (৪০)। বর্তমানে এরা সবাই বাগেরহাট কারাগারে আটক রয়েছে। অপরদিকে গত ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে আধা মণ হরিণের মাংসসহ মিলন মোড়ল (৩৫) নামক এক যুবককে শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন দাসের বারানি এলাকা থেকে বনরীরা আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। আটক মিলন যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার দেউলি গ্রামের আব্দুল লতিফ মোড়লের ছেলে। মিলন সোনাতলা এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতো। সূত্র জানায়, হরিণ, বাঘ ও বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের সদস্যরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে আটক হয়ে কারাগারে গেলেও আইনের ম্যারপ্যাঁচে কিছুদিন পর এরা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় এসব অপকর্মে নেমে পড়ে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ার সুবাদে এসব পাচারকারীদের গড ফাদাররা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে অবাধে এসব অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে চলেছে। অন্যান্য সময়ের চেয়ে বছরের শীত মৌসুমে বনের অভ্যন্তরে এ চক্রের সদস্যদের আনাগোনা অনেক বৃদ্ধি পায়। সুন্দরবন নিয়ে গবেষণা করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘স্যেভ দা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, বন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আধুনিক জলযান সংকট, দুর্বল বন আইনসহ সঠিক বন ব্যবস্থাপনার অভাব, মামলা পরিচালনায় দতার অভাবসহ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রভাবশালী গডফাদারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না। একই সাথে আটককৃতরাও সহজে আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে পড়ে ফলে সুন্দরবনে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বন্যপ্রাণী হত্যা। এদিকে, সুন্দরবনে চোরা শিকারি পাশাপাশি বাঘের আবাসস্থল তিগ্রস্ত হওয়ার কারণেও হুমকির মুখে রয়েছে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। এ অবস্থায় চলতে থাকলে হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ মূল্যবান বন্যপ্রাণী। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বর্তমানে সার্বণিক সুন্দরবন পাহারায় আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং চালানো হচ্ছে। সুন্দরবনের চোরা শিকারী ও গডফাদারাও আমাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছেনা।

ভাগ