স্টাফ রিপোর্টার ॥ হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন যশোর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হুদা। বৃহস্পতিবার বাদ আসর যশোর ঈদগাহে জানাজার আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদর্শন করা হয়। এর আগে বেলা তিনটায় জেলা বিএনপি কার্যালয়ে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত হয় মরহুম শামসুল হুদার লাশের কফিন। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার রাতে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন সৎ ও মেধাবী রাজনীতিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হুদা। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তিনি বেশ কয়েকদিন ধরে ওই যশোর ও ঢাকায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলহাজ আনিছুর রহমান মুকুল জানান, বুধবার রাত ১০ টার দিকে ঢাকা থেকে একটি ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে শামসুল হুদার মরদেহ নিয়ে যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা হন তার স্বজনরা। এরপর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডের বাসভবনে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায়। মরদেহ বাসায় পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্নায় সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতরণ হয়। সকাল থেকেই মরহুমের বাসায় রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এসে জড়ো হন। সকালে বাসায় ছুটে যান বিএনপির যশোর জেলা শাখার আহ্বায়ক অধ্যাপক নার্গিস বেগম, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট জাফর সাদিক, গোলাম রেজা দুলু, অ্যাড. মোহাম্মদ ইসহক, আব্দুস সালাম আজাদ, মিজানুর রহমান খান, নগর বিএনপির সভাপতি মারুফুল ইসলাম, জাসদ নেতা অ্যাড. রবিউল আলম, অশোক রায়, জাপা নেতা শরিফুল ইসলাম সরু চৌধুরীসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা মরহুমের স্বজনদের পাশে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটান।
বেলা তিনটার দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জেলা বিএনপির কার্যালয়ে। এ সময় সেখানে আগে থেকে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীরা তাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য ভিড় করেন। জেলা, উপজেলা ও বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা একে একে তার কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় ও দলীয় পতাকায় আচ্ছাদিত বীর এ মুক্তিযোদ্ধার কফিনে প্রথমে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক নার্গিস বেগমের নেতৃত্বে জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
এসময় সেখানে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য গোলাম রেজা দুলু, অ্যাড. মোহাম্মাদ ইসহক, আব্দুস সালাম আজাদ, আলহাজ মিজানুর রহমান খান, আলহাজ আনিছুর রহমান মুকুল, নগর বিএনপির সভাপতি মারুফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মুনীর আহম্মদ সিদ্দিকী বাচ্চুসহ আরও অনেকে। এরপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, মারুফুল ইসলাম ও মুনীর আহম্মদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে নগর বিএনপি, নুরুন্নবী ও কাজী আজমের নেতৃত্বে যশোর সদর উপজেলা বিএনপি, অ্যাড. শহীদ ইকবালের নেতৃত্বে মনিরামপুর থানা ও পৌর বিএনপি, জাগপা নেতা নিজাম উদ্দীন অমিত, ফেরদৌসী বেগমের নেতৃত্বে জেলা মহিলা দল, অ্যাড. আমিনুর রহমান ও আব্দুল লতিফ লতার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, রবিউল ইসলাম ও মোস্তফা আমীর ফয়সালের নেতৃত্বে জেলা স্বেচ্ছাসেবকদল, উপাধ্যক্ষ মকবুল হোসেনের নেতৃত্বে জেলা কৃষকদল, এসএম মিজানুর রহমান ও সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে জেলা শ্রমিকদল, এম তমাল আহমেদ ও আনসারুল হক রানার নেতৃত্বে জেলা যুবদল, এহসানুল হক মুন্নার নেতৃত্বে সাবেক যুবদল নেতৃবৃন্দ, সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে তাঁতীদল যশোর জেলা শাখা, অ্যাড. আবু মুরাদ ও আজিজুল কামাল সুইটের নেতৃত্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ, শামসুর রহমান ও মশিয়ার রহমানের নেতৃত্বে বাঘারপাড়া থানা ও পৌর বিএনপি, এমএ সালামের নেতৃত্বে চৌগাছা থানা বিএনপি, আলহাজ খাইরুজ্জামান ও আবু হাসান জহিরের নেতৃত্বে শার্শা থানা বিএনপি, গোলাম হায়দার ডাবলুর নেতৃত্বে অভয়নগর থানা বিএনপির নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
দলীয় কার্যালয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরহুমের লাশ বিকেল সাড়ে তিনটার দিক নিয়ে যাওয়া হয় শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহে। সেখানেও জানাজার আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মরহুমকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এসময় কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষ থেকে খুলনা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাসদ নেতা অ্যাড. রবিউল আলম, অশোক রায়, মুক্তিযোদ্ধা মুজহারুল ইসলাম মন্টু, জাপা নেতা শরিফুল চৌধুরী সরুসহ যশোরের বিভিন্ন থানার বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনসমূহের নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীদের ফুলেল শ্রদ্ধা শেষে প্রয়াত এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মাননা প্রদান করা। এ সময় একদল চৌকস পুলিশ সদস্যর অংশগ্রহণে গার্ড অব অনার পরিচালনা করেন যশোর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাকির হোসেন। রাষ্ট্রীয় নিয়ম কানুন শেষে মরহুমের জানাজার প্রস্তুতি নেয়া হয়। জানাজার আগে উপস্থিত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন দলের খুলনা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু ও মরহুমের জামাতা মাসুদ করিম।
জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হুদা একজন সৎ নিষ্ঠাবান রাজনীতিক ছিলেন। তিনি যেদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করেন সেদিন থেকেই তিনি সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত এই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। জীবদ্দশায় তিনি সরকারের অনেক জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৭ টি মামলার বোঝা নিয়ে তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়ে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের রণাঙ্গনের একজন বীর যোদ্ধা।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আজকের এই দ্বিধাবিভক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্বপালন করতে গিয়ে মরহুম শামসুল হুদা হয়তো সবার মন জয় করতে পারেননি। তাই তার আচরণে কেউ যদি সামান্যতম কষ্ট পেয়ে থাকেন আমি তার পরিবারের পক্ষ থেকে সকলের কাছে দোয়া কামনা করছি। অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্যের পর মরহুমের জামাতা মাসুদ করিম সবার কাছে তার শ্বশুরের জন্য দোয়া কামনা করেন। সর্বশেষ নামাজে জানাজা শেষে তাকে শহরের কারবালা কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজার নামাজ পড়ান মুফতি মো. ইলিয়াস হোসেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হুদার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গতকাল এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, “শামসুল হুদার মৃত্যুতে আমি তাঁর শোকার্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছি।
সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর নীতি ও আদর্শ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শণে গভীরভাবে বিশ^াসী বলিষ্ঠ সংগঠক মরহুম শামসুল হুদা যশোর জেলা বিএনপিকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে অকান্ত পরিশ্রম করেছেন। মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করতেন বলেই এলাকার সর্বসাধারণের নিকট তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় নেতা।
বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ছিলেন সৎ ও সজ্জন মানুষ।
‘৭১ এর রণাঙ্গনে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অবদানের জন্য দেশবাসীর নিকট তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দোয়া করি মহান রাব্বুল আলামীন যেন মরহুম শামসুল হুদাকে জান্নাত নসীব এবং শোকাহত পরিবারবর্গকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা দান করেন। আমি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যবর্গ, আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।”





