চৌগাছায় কুমড়া বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত মহিলারা

0

এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর)যশোরের চৌগাছায় কুমড়া বড়ি তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মহিলারা। তারা মাশ কলায়ের ডাল ও চাল কুমড়া দিয়ে বড়ি তৈরি করেন। শীত মৌসুমে গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে মাশকলাই আর চাল কুমড়া দিয়ে বড়ি বানানোর ধুম পড়ে যায়। হাতে তৈরি শীতের এ বিখ্যাত বড়ি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাইরেও যাচ্ছে। শীত মৌসুমে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ কুমড়াবড়ি প্রাচীনকাল থেকেই খাদ্য তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। যা আজও টিকে আছে এই অঞ্চলে।
জানা যায়, গ্রামবাংলায় ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ডাল ও কুমড়ার তৈরি বড়ি। শীত মৌসুম মানেই গ্রামবাংলার মানুষের কাছে নতুন নতুন খাবার তৈরির মৌসুম। শীতের পিঠা-মিঠাই-খির-পায়েশের পাশাপাশি ডালের তৈরি বড়িও একটি সুস্বাদু খাবার বলে সর্বজন পরিচিত।
উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের গৃহবধূ রুমা খাতুন বলেন, বড়ি তৈরির উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয় মাশকলাই (কালো কলাই) ও চাল কুমড়া। অনেকে কুমড়া ছাড়াও মুলা, পেঁপে, পিয়াজ ও মানকচুকে ব্যবহার করে থাকেন। মাশকলাই পাথরের জাঁতায় মাড়াই করতে হয়। বর্তমানে খুষা ছাড়ানো মাশকলাই বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। যা সূক্ষ্মভাবে পরিষ্কার করে কমপক্ষে ১০/১১ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। আর পাকা চালকুমড়া, মুলা, পেঁপে, পিয়াজ কিংবা মানকচু চিরে ঝিনুক, চামচ বা কুরানি দিয়ে কুরে মূল উপাদান (সাষ) নিতে হয়। কুরে তা পরিষ্কার কাঁপুড়ে ফেলে পানি (নিংড়ানো) মুক্ত করতে ৫/৬ ঘন্টা সময় দিতে হয়। এরপর পানিতে ভিজিয়ে রাখা মাশকলায়ের ডাল মেশিন-ঢেঁকি বা শিলপাটায় পিষে খামির তৈরি করা হয়। মুলত খাদ্য হিসাবে খুবই সুস্বাদু হলেও বড়ি তৈরিতে মহিলাদের দারুন পরিশ্রম করতে হয়।
পৌর শহরের পুতুল রানী বলেন, শীত মৌসুম এলে গ্রামাঞ্চলে সন্ধ্যার পর বড়ি কুটতে ঢেঁকির ঠকঠকানি শব্দ গভীর রাত পর্যন্ত শোনা যায়। কারণ একটি ঢেঁকিতে পাড়ার ২০/২৫ ঘরের বড়ি পাড়াতে (কুটতে) হয়। কিন্তু বর্তমানে ঢেঁকির ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। অনেকে মিল বা ইঞ্জিনচালিত মেশিনে বড়ি কুটে থাকেন। তবে ঢেঁকিতে পাড়ানো বড়ির স্বাদ বেশি হয়ে থাকে।
পৌর শহরের আ¤্রকানন পাড়ার ডলি বেগম বলেন, সন্ধ্যা বা রাতে ঢেঁকিতে কুটা, শিলপাটায় পিষা, মিল বা ইঞ্জিনচালিত মেশিনে কুটা মাশকলায়ের খামির ও পানি নিংড়ানো চালকুমড়ার পাত্র রাতভর শীতের শিশিরে রাখতে হয়। পরের দিন কাকডাকা ভোরে নিজেরা ও প্রতিবেশী মহিলারা বাড়ীর ছাদে অথবা যেখানে রোদ পাওয়া যায় সে খানে বসে যান বড়ি দেওয়ার কাজে। মাশকলায়ের খামির ও কুমড়ার সিটা ভাল করে মিশিয়ে (ফেনিয়ে) কাঠ বা বাঁশের চালীর ওপর পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে, পরিষ্কার টিন অথবা ফ্রেম করে তৈরী করা নেটের ওপর মমতা মাখা হাতের মুঠোয় পাঁচ আঙ্গুলের কৌশলে বসানো হয় ১টি করে বড়ি। হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় বিশেষ কৌশলে বড়ি বসানো হয়। এরপর কাঁচা বড়ি শীতের রোদে শুকানো হয়।
একই পাড়ার মেহেরুন খাতুন বলেন, বড়িগুলো দেখেই মনে হয় শিল্পকাজ, যেন নীল আকাশের বুকে সাদা তারার মেলা। অনেক পরিবার বড়ি দিয়ে তা বাজারে বিক্রি করে সংসারে বাড়তি ইনকাম করে থাকেন। অনুকুল তীব্র রৌদ্রময় আবহাওয়া ও তীব্র শীতে বড়ি দিলে স্বাদ ভালো হয়।
এদিকে পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের দরিদ্র মহিলারা শীতের বড়ি তৈরী ও বাজারে বিক্রি করে সংসারে বাড়তি আয় করে থাকেন।