লোকসমাজ ডেস্ক॥ করোনা মহামারির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি যখন মহাসংকটে, তখন দেশের অর্থনীতির ২টি সূচকে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েই চলেছে আর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ভর করে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়েছে। যা পাকিস্তানের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাকালে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে অর্থনীতির দু’একটি সূচকে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সেই প্রভাব এখন গার্মেন্ট ও রেমিট্যান্সে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন তারা। তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে: বিশ্বব্যাপী বিশেষত ইউরোপে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হলেও এখনো বড় আঘাত লাগেনি। সর্বশেষ নভেম্বর মাসের হিসাবে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেনি। বরং গত বছরের নভেম্বরের চেয়ে সামান্য বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ৩০৭ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলারের। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার। অবশ্য নভেম্বরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ৮.২০ শতাংশ। এই সময়ে তৈরি পোশাকসহ বেশিরভাগ পণ্যই রপ্তানির লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এ ছাড়া ইপিবির হিসাব অনুযায়ী চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাস (জুলাই-নভেম্বর) পর্যন্ত সার্বিকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ (০.৯৩ শতাংশ)। করোনার এই ক্রান্তিকালেও রপ্তানি না কমে যাওয়াকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
বিজিএমইএর পরিচালক শহীদুল হক মুকুল বলেন, ক্রেতারা এখন তাদের গুদামে কোনো পণ্য জমা রাখতে চাইছেন না। অল্প অল্প করে ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন। কেউ কেউ হয়তো পণ্য নেয়া পিছিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বাতিল করছেন না। বর্তমানে করোনার দ্বিতীয় প্রবাহের পরিস্থিতির মধ্যেও রপ্তানি না কমে যাওয়াই ইতিবাচক দিক। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য করোনাভাইরাসের টিকা অনুমোদন দেয়ার পর মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। ফলে নতুন করে রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। রেমিট্যান্সে ভর করে রিজার্ভ রেকর্ড: করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে রেমিট্যান্স কমবে বলে ধারণা করা হলেও তা উল্টো বাড়ছেই। বছর শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ বাকি থাকতেই ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবশেষ রেমিট্যান্স প্রবাহের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম ১০ দিনে ৮১ কোটি ৪০ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। সব মিলিয়ে ১লা জানুয়ারি থেকে ১০ই ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ২০.৫০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সালের পুরো সময়ের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। এর আগে এক বছরে বাংলাদেশে এতো রেমিট্যান্স আর কখনো আসেনি। ২০১৯ সালে ১৮.৩৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-নভেম্বর ৫ মাসে মোট ১০.৯০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। এই হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরের ১লা জুলাই থেকে ১০ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ১১.৭০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৩ শতাংশ।
আর ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ ৬ মাসে (২০০০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩০শে জুন) এসেছিল ৮.৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেই অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২.৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, মহামারির এই কঠিন সময়েও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বেড়েই চলেছে। আর এ কারণেই বছর শেষ না হতেই ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বছর শেষে তা ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে আশা করছি। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিভিন্ন দেশে থাকা ১ কোটির বেশি বাংলাদেশির পাঠানো এই অর্থ। দেশের জিডিপিতে সবমিলিয়ে রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো। রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে গত অর্থবছর থেকে ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। নতুন মাইলফলকে রিজার্ভ: এদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ভর করে মহামারির মধ্যেই বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন (৪ হাজার ২০০ কোটি) ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া বিজয় দিবসে জাতির জন্য উপহার। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরাট সুখবর, দেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যেও শুধু ডিসেম্বরের ১৪ দিনে ১.০৩৪ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত অর্থবছরের ঠিক এই সময়ে, যা ছিল ৮৬৯ মিলিয়ন ডলার। জুলাই-নভেম্বর পাঁচ মাসে মোট ১০.৯০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরের ১লা জুলাই থেকে ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি। গত বছরের ১৫ই ডিসেম্বর রিজার্ভ ছিল ৩২.১১ বিলিয়ন ডলার। গত ২৯শে অক্টোবর তা প্রথমবারের মতো ৪১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে এবং মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে তা দাঁড়িয়েছে ৪২.০৯ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ডে। রিজার্ভের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্রবাহ।
স্টেট ব্যাংক অব পাকিন্তানের তথ্যে দেখা যায়, ৪ঠা ডিসেম্বর পাকিস্তানের রিজার্ভ ছিল ২০.৪ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন পাকিস্তানের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি।





