ভ্যাকসিন ভাবনায় আমজনতা

লোকসমাজ ডেস্ক॥ বিশ্বের সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের চোখ এখন করোনা ভ্যাকসিনের দিকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত সেই টিকা এরইমধ্যে প্রয়োগ শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পর আমেরিকা, কানাডা এবং গতকাল সৌদি আরবে ফাইজারের টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশেও জানুয়ারিতে আসছে টিকা। দেশের মানুষ সেই টিকার অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছে। টিকা গ্রহণের পর যুক্তরাজ্যে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এ টিকা নিয়ে যেমন আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তেমনি রয়েছে শঙ্কাও। এ অবস্থায় ভ্যাকসিন নিয়ে সাধারণ মানুষ কি ভাবছেন? গতকাল রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা হয় ভ্যাকসিন ও তার প্রয়োগ নিয়ে।
উত্তরে কেউ কেউ বলেছেন, মহামারি করোনা ঠেকাতে ওষুধের দরকার। আর এ ওষুধ আমাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে করোনামুক্ত পৃথিবী দেখার। কেউ করোনাভাইরাসের টিকা নিতে আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন। আবার কেউ টিকা নেবেন না বলে সোজা জানিয়ে দেন। ফার্মগেটে পান সিগারেট বিক্রেতা সিয়াম বলেন, দেশেতো টিকা আসতেছে শুনলাম টিভিতে। এই টিকা আগে বড়লোকরা পাক। এরপর তারা কয়েকবার করে নেয়ার পর যদি আমরা পাই নেবো। আর তারা নিতে নিতে টিকা নকলও হয়ে যেতে পারে। ফুটপাথে জুতা কিনছিলেন মনিরা বেগম। জানতে চাইলে তিনি কিছুটা লাজুক মুখে বলেন, আমার জন্য লাগবে না। আমার নাতিন দুটারে দিলেই হবে। আপনি দিলে নিবেন কিনা? এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, দিলে তো নিমুই।
রিকশাচালক শুভ মিয়া। ফার্মগেটে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন। বলেন, এই টিকাটা খুব দরকার। টিকা এলে ভার্সিটি খুলবো। আগে এখানে দাঁড়াইলে আহসানউল্লাহ ভার্সিটির পোলাপাইনের ভাড়া পাইতাম। সকালেই কামাই হইয়া যাইত ২০০-৩০০ টাকা। এখন সকালে বের হইলে ১০০ টাকার বেশি কামাই হয় না। আবার ভার্সিটি ছুটির পরেও ভাড়া হইত। ভার্সিটিটা বন্ধ। ভাড়াও নাই। বাসে পেয়ারা বিক্রি করছিলেন সুজন মিয়া। বলেন, টিকা নেয়া লাগলে নেবো। সবাই যদি নেয় আমিও নেবো। আমার কাছে টিকাটা বড় নয়। করোনার আগে আমার ফরিদপুরের ভাঙ্গায় একটা ফুসকা, চটপটির দোকান ছিল। করোনার সময় বন্ধ হয়ে গেল। আর চালু করতে পারিনি। এখন ঢাকায় বাসে বাসে গলা ফাটায়ে পেয়ারা ও বরই বেচি। আমার দোকানটা ছিল স্কুলের সামনে। টিকা এলে যদি দোকানটা খুলতে পারি। টিকা এলে অবশ্যই নিবো। মালিবাগ রেলগেট সংলগ্ন চা দোকানি মো. লিটন। করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে তার মধ্যে নেই কোনো উৎসাহ। তিনি বলেন, দেশে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন আসবে তা জরুরি সেবায় নিয়োজিতরাই পাবেন। আমরা পাবো কীভাবে? আমরা তো সাধারণ মানুষ। ভ্যাকসিন কল্পনায়ও আনতে পারছি না। মারা গেলে এমনিতেই যাবো। ভ্যাকসিন আমাদের দরকার হবে না। মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ঢাকায় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কর্মরত। দেশে করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়ার পর বেশ আতঙ্কেই কেটেছে তার বিগত দিনগুলো। প্রতিনিয়ত ভয় নিয়ে ঘুরছেন রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে করোনার ভ্যাকসিন আসবে এটা ভালো খবর। সবার ভাগ্যে সেই ভ্যাকসিন জুটবে না। আমি ভ্যাকসিন পাবো বলে আশা করতে পারছি না। প্রভাবশালীদের ভিড়ে আমার মতো সাধারণ মানুষ পাবে না।
কাওরান বাজার এলাকায় ব্যবসা করেন আবদুল লতিফ। করোনার ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না তিনিও। বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই। লকডাউনের সময়ে কোনো কাজকর্ম করতে পারিনি। ভ্যাকসিন তো অনেক দামি জিনিস। এটা কি আর আমরা পামু। একই কথা বললেন, বাদাম বিক্রেতা মাসুম। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন না পেলেও কষ্ট নেই। কারণ গরিব মানুষদের ভ্যাকসিন লাগে না। আমার ভ্যাকসিন পাওয়ার আগে খাওয়া-থাকার নিশ্চয়তা চাই। মাছ বিক্রেতা জোসনা বেগম জানান, করোনার বিপদে সরকারের চাল পাইনি, না খেতে পেরে গ্রামে চলে গেছি। পরে আবার কাজের খোঁজে ঢাকায় আসছি। ভ্যাকসিনের আশা করি কীভাবে? সরকার যদি আমাদেরকে ফ্রি দেয় তাহলে নিতে পারবো। তিনি বলেন শুনেছি, অনেকেই বলেছে ভ্যাকসিন নিবে না। এটা নিলে নাকি মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে। আমাদের দেশে কেউ অসুস্থ হলে সেদিকে আর যাবো না। ফল বিক্রেতা আবদুল হাকিম জানান, টিভি ও ফেসবুকে দেখেছি করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। আমাদের দেশে নাকি আগামী মাসে আসছে। এই ভ্যাকসিন আসলেও সাধারণ জনগণ পাবে না। চলে যাবে নেতা ও টাকা-পয়সাওয়ালাদের হাতে। তাছাড়া কালোবাজারেও সরকারি ভ্যাকসিন চলে যাবে। নিম্নবিত্ত মানুষ এমনিতেই মাস্ক পরতে চায় না। তারা ভ্যাকসিন তো জীবন দিলেও কিনবে না।
রিকশাচালক করিব হোসেন বলেন, ভ্যাকসিন নিবো না। ওসব আমাদের লাগবে না। আমরা খেটে খাই। ভাতই পাই না, ভ্যাকসিন দিয়ে কি করমু। যাদের প্রয়োজন তারা ভ্যাকসিন নিবে। নুশরাত মুনিয়া নামের এক স্কুল শিক্ষিকা বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন জানুয়ারি মাসে ৫০ লাখ করোনার টিকা আসবে। সেসব নাকি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দিবে। তাহলে তো আমাদেরও না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি মনে করি শিক্ষক ও সব ছাত্রকে টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া উচিত। কেননা করোনার মধ্যে সবকিছু কম-বেশি স্বাভাবিকভাবে চললেও শিক্ষাব্যবস্থা থেমে আছে। তাই জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করলে এ বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে পারে। এছাড়া গরিব অসহায় মানুষ তো পরের কথা। তারা তো ভ্যাকসিনের ধারে-কাছেও যাবে না। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন সঠিকভাবে বণ্টন হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। ভ্যানচালক নসু নিয়া বলেন, ভ্যাকসিন আসলে আমার লাভ নেই। আমি টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন নিবো না। তাছাড়া আমার লোকজনও নেই, যে আমি ভ্যাকসিন পাবো। তাই কোনো আগ্রহও নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ ফ্রিতে দিলে নিতে পারি। কিনে নেয়ার জন্য আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সামর্থ্য থাকবে না। সরকার যদি প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের দিয়ে সঠিক ভাবে বণ্টন করে তাহলে আমজনতা ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নয়তো কোনোভাবেই গরিব মানুষের কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছাবে না। কাওরান বাজারে ফুটপাথে কাপড় বিক্রি করছেন মনির হোসেন। তিনি বলেন, আশা করি আমার করোনা হবে না। ভ্যাকসিন নিয়ে চিন্তা নেই। নিয়মিত হাত-মুখ পরিষ্কার রাখি। মহিম মিয়া নামের এক সিএনজি চালকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, সরকার ভ্যাকসিন আনবে শুনেছি। সেই ভ্যাকসিন কারা পাবে জানি না। এই শীতে করোনার বিস্তার অনেক বাড়বে এমনটাও শোনা যাচ্ছে। আমাদের দেশে তো করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা টিকা সবার তো হবে না। টিকার দাম বেশি হলে কম আয়ের মানুষ নিবেও না। যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, করোনার টিকা নাকি ১০ ধরনের জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেয়া হবে। আমাদের সিরিয়াল কত নম্বরে সেটা জানি না। যদি সঠিকভাবে বণ্টন হয় তাহলে হয়তো পাওয়ার আশা করা যায়। ফার্মগেটে ভেলপুরিতে ভ্রাম্যমাণ দোকান দিয়ে বসেছেন ইউনুস আলী। বিকাল সময়টায় বেশ বেচাকেনায় ব্যস্ত। বাংলাদেশে করোনার ভ্যাকসিন আসছে। এই প্রশ্ন তুলতেই ক্ষেপে গেলেন ইউনুস আলী। তিনি বলেন, গরিব মানুষের করোনা হইছে আপনি শুনছেন? এগুলা বড়লোক মানুষের রোগ। আমাগো টিকা লাগবো না।কাওরান বাজারের সবজি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, টিকা এলে অবশ্যই নেবো। কিন্তু আমাদের মতো গরিব মানুষের কাছে টিকা আসতে আসতে বেঁচে থাকলেই হয়। আগে সরকারের লোক, ধনী লোকরা নিবে তারপর যদি আমাদের কাছে কয়েক বছর পর টিকা আসে! আরেক সবজি বিক্রেতা মো. আলী জানেন না করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনলেন ভ্যাকসিন কোন দেশ আবিষ্কার করেছে? বাংলাদেশে কবে আসবে? এরপর তিনি বলেন, প্রথমেই টিকা নিবো না। প্রথমে বছরখানেক দেখবো। মানুষের কিছু হয় নাকি। যদি দেখি টিকা নেয়ার পর কারো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তারপর নেবো।

ভাগ