অর্থ জোগান নিয়ে চাপে নেই সরকার

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥করোনা মহামারীর মধ্যে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিল সরকার। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থসংস্থানের। যদিও অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে দেখা যাচ্ছে, অর্থের জোগান নিয়ে তেমন কোনো চাপে নেই সরকার। উল্টো করোনাকালেও বাড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়। কমছে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা। মুদ্রাবাজারে অলস তারল্যের জোয়ার সরকারের সুদ ব্যয়ও অনেক কমিয়ে এনেছে। সরকারের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও ফিরেছে রেকর্ড উদ্বৃত্তের ধারা। রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে বেড়ে চলেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সব মিলিয়ে মহামারীর দুঃসময়েও অর্থের সংস্থান ও উৎস নিয়ে সরকার বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই আছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৫০ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক খাত থেকে ২৭ হাজার ১১৪ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছিল সরকারকে। অথচ চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। ব্যাংক খাত, সঞ্চয়পত্র ও বিদেশী উৎস মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩১ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে এসব উৎস থেকে সরকারকে মোট ঋণ নিতে হয়েছিল ৩৭ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিতে ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি করে সরকার। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিল-বন্ডের সর্বনিম্ন সুদহার ছিল ৭ শতাংশের বেশি। অথচ চলতি ডিসেম্বরে সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খরায় দেশের ব্যাংক খাতে সৃষ্টি হয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য। ব্যাংকগুলোতে পড়ে থাকা অলস তারল্যের সুফল পাচ্ছে সরকার। এতে সরকারের সুদ ব্যয় অর্ধেকেরও অনেক নিচে নেমে এসেছে।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৭১ কোটি ডলার ঘাটতি ছিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫৩ কোটি ডলার। একই সঙ্গে সরকারের ব্যালান্স অব পেমেন্টেও (বিওপি) রেকর্ড উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিওপিতে ২০ কোটি ডলার ঘাটতি থাকলেও চলতি বছরের একই সময়ে উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০৯ কোটি ডলার।
অর্থনীতির বিদ্যমান পরিস্থিতিকে সুখকর বলে মনে করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। তিনি বলেন, মহামারীর মধ্যে অর্থের উৎসগুলো ঠিক রাখা সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছি। এরই মধ্যে আমরা সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে এনে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছি।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দেয়ায় জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরেছে। এরই মধ্যে দেশের বেসরকারি খাতও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের শতভাগ বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি খাতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। ব্যাংক খাতে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়ায় ব্যাংক খাতে অর্থের কোনো সংকট হয়নি। ফলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ভালোভাবেই চলমান রয়েছে।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে সরকার। রেকর্ড এ বাজেটের মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের বাকি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয় ঘাটতি হিসেবে। ঘাটতি এ বাজেট পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকার। বাকি অর্থ সঞ্চয়পত্রসহ অভ্যন্তরীণ অন্য উৎস এবং বিদেশী উৎস থেকে সংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
জুনে যখন নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়, তখন দেশের অর্থনৈতিক কর্মতত্পরতা ছিল প্রায় স্থবির। করোনার আতঙ্কে মার্চ থেকেই টানা তিন মাস দেশের মানুষ ছিল প্রায় গৃহবন্দি। তার পরও চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পরিসংখ্যান বলছে, বাজেট বাস্তবায়নে অর্থের কোনো সংকট নেই সরকারের। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আয় না হলেও বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আয়ে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। শুল্ক, মূসক, আয়কর ও অন্যান্য উৎস থেকে রাজস্ব আয় অল্প হলেও বেড়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৯৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রথম প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় কম হয়েছে।
মহামারীর মধ্যেও কর্মীরা ইতিবাচক ভূমিকা রাখায় রাজস্ব কমেনি বলে জানান এনবিআরের সদস্য (করনীতি) মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, করহার কমানো এবং করের আওতা বাড়ানোর কারণে করদাতারা নাগরিক দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক মানসিকতা দেখিয়েছেন। এছাড়া মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে এবং কর সার্কেল ও জোনগুলোও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। রাজস্বসংক্রান্ত যেসব বিরোধ আছে সেগুলো থেকে আদায়ের কার্যক্রম আরো জোরদার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের গতি দৃশ্যমান হচ্ছে। অর্থবছরের বাকি সময়ে রাজস্ব আদায়ের গতি আরো বাড়বে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিদেশী উৎস থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় বেশি ঋণ-অনুদান পেয়েছে সরকার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিদেশী উৎস থেকে সরকার ঋণ পেয়েছিল ৫ হাজার ১ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরে সরকার বিদেশী উৎস থেকে ৮ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যখন ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, তা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। যদিও অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক পার করে দেখা যাচ্ছে, সরকার আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক খাত থেকে এক-তৃতীয়াংশ ঋণও নেয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ২৭ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৮৫০ কোটি টাকায় নেমেছে। ট্রেজারি বিল-বন্ডের ইল্ড রেট অর্ধেকের নিচে নেমে যাওয়ায় কম সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছে সরকার।
গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অস্বাভাবিক পতন হয়েছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি ১৪৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নিট ১১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। যদিও সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে চলতি অর্থবছরে সরকারের ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারিত আছে ২০ হাজার কোটি টাকা।
দুই বছর ধরেই দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে খরা চলছিল, যা করোনাভাইরাসের ধাক্কায় আরো খারাপ হয়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। যদিও এ সময়ে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বেসরকারি খাতে অর্ধলক্ষ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে। করোনায় বড় ধাক্কা খাওয়া দেশের আমদানি খাত এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই-অক্টোবর সময়ে আমদানি কমেছে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদ। তিনি বলেন, এটি ঠিক, সরকার এ মুহূর্তে কোনো অর্থ সংকটে নেই। ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ অলস তারল্য সৃষ্টি হয়েছে। রেমিট্যান্স বাড়ার বিপরীতে আমদানি খাত নেতিবাচক হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রাও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আছে। সরকার চাইলে কম সুদে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার দায়িত্বও সরকারের। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে না।
কেএএস মুরশিদ বলেন, মহামারীর মতো আর্থিক বিপর্যয়ের সময় সবার আগে সরকারকে এগিয়ে আসতে হয়। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করার সাহস পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় সরকারকেই বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। যদিও আমরা এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে সেভাবে উদ্যোগ দেখছি না। চাহিদা না থাকার কারণেই ব্যাংকগুলোতে অলস তারল্য বাড়ছে।