ঢাকা ছাড়া মিলছে না পোড়ার চিকিৎসা : ঠাঁই নেই বার্ন ইনস্টিটিউটে

লোকসমাজ ডেস্ক॥ কোথাও সেবা বন্ধ ওয়ার্ডবয়ের অভাবে, কোথাও চিকিৎসক আছেন একজন। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ নেই। বন্ধ রয়েছে বার্ন ইউনিট। কোথাও সংকট যন্ত্রপাতির। এই হলো সারা দেশে আগুন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কিংবা অ্যাসিডে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার চিত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোড়ার ঝুঁকি সব খানে। চিকিৎসা কেবল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক্স হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (নিটোর) বার্ন চিকিৎসায় বিশেষ ইউনিট থাকলেও করোনার ইউনিট চালু হওয়ায় সেসব হাসপাতালে এখন বার্নের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্লাস্টিক সার্জারি অ্যাকটিভিটি রিপোর্টের তৃতীয় সংস্করণে বলা হয়েছে, আগুনে পোড়া রোগীদের ৩৪ শতাংশই মারা যান। সচেতনতা আর যথাযথ চিকিৎসার অভাবে এই মৃত্যু হচ্ছে। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন এ প্রতিবেদককে বলেন, পরিস্থিতি খুবই কঠিন। শীতের দিনে কভিড বাড়ছে, বার্নও বাড়ছে। এই হাসপাতাল ছাড়া সারা দেশে বার্ন চিকিৎসার প্রোপার জায়গা কোথাও নেই। ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটটিও কভিড ইউনিট হয়ে গেছে। পুরো চাপ ইনস্টিটিউটের ওপর পড়েছে। এখানে একটি বেডও খালি নেই। ঢাকার বাইরে থেকে নিয়মিত রোগী আসছে। গত সপ্তাহে এক মিটিংয়ে মন্ত্রী ও সচিবকে ঢামেক হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী, মিটফোর্ড ও নিটোর বার্নের জন্য অল্প করে পরিসর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি।
জানা যায়, ২০১০ সালে রাজধানীর নিমতলী দুর্ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যুর পর দেশের ১৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১০টি হাসপাতালে সেই উদ্যোগ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে জরুরি ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ৬৪ হাজার ৮৯৩ জন। হাসপাতালে ভর্তি হন ৮ হাজার ৯৩৪ জন। প্রতিদিন গড়ে ২০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব রোগীকে চিকিৎসা দিতে আছেন তিন থেকে পাঁচজন চিকিৎসক। ৫০০ শয্যার এই প্রতিষ্ঠান চলছে জনবল সংকটের মধ্য দিয়ে। এখানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১ হাজার ১২২। কাজ করছেন ৪৬৪ জন। পদ শূন্য ৫৯ শতাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১২ মার্চ বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলায় ৮ শয্যা নিয়ে বার্ন ইউনিট চালু করা হয়। পরে ১০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও রোগীদের চাপ সামাল দিতে ৩০ থেকে ৩২টি শয্যা সরবরাহ করে কর্তৃপক্ষ। এই বিভাগে চিকিৎসাসেবা দিতে ৮ চিকিৎসক এবং ১৬ নার্স ও ব্রাদারের পদ রাখা হয়। গত এপ্রিল থেকে বিভাগটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০৮ সালে ১৩ শয্যার বার্ন ইউনিট করা হয়। ২০১২ সালে করা হয় ২৬ শয্যার বিভাগ। বিভাগটিতে রোগী থাকে শয্যার দ্বিগুণের বেশি। শ্বাসনালি দগ্ধ রোগীদের জন্য আইসিইউ দরকার হলেও তা সেখানে নেই। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট চালু হয় ২০১৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর। এখন শয্যা ৩৬টি। ইউনিটটিতে চিকিৎসকদের পাঁচটি পদ রয়েছে। কাজ করেন একজন। এখানে কোনো আইসিইউ নেই। অন্যদিকে খুলনায় শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ২০ শয্যা নিয়ে বার্ন ইউনিট চালু হয় ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এখানেও ইউনিটের জন্য আলাদা আইসিইউ নেই। সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু হয় ২০১১ সালে। এখানে একজন চিকিৎসক চিকিৎসাসেবা দেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৫ সালে বার্ন ইউনিট এবং ২০১৭ সালে বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। রোগীদের জন্য ৩২ শয্যা রয়েছে। চিকিৎসক আছেন পাঁচজন। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কিংবা এর বেশি দগ্ধ রোগীদের ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ২০১৩ সালের জুলাইয়ে চালু হয়। সব মিলিয়ে ৩৫ শয্যা। বার্ন ইউনিটটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সঙ্গে লাগোয়া মূল ভবনে। চিকিৎসকের ৯ পদের ৬টি ও নার্সের ২০ পদের ৮টি খালি। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি যন্ত্রপাতিও নেই। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ চালু হয় ২০১৪ সালের জুলাইয়ে। চিকিৎসকদের ৯টি পদে ৩ জন ও নার্সদের ২৪টি পদে ৬ জন কাজ করছেন। দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক কোনো বার্ন ইউনিট নেই। ২০১৪ সালে হাসপাতালের নিচতলায় একটি কক্ষে ২০ শয্যার বার্ন ইউনিট চালু করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো যন্ত্রপাতি নেই। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু হয় ২০১২ সালের নভেম্বরে। ১২ শয্যার ইউনিটে নিয়মিতভাবে রোগী থাকেন শয্যা সংখ্যার বেশি। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের নবনির্মিত ভবনে বার্ন ইউনিট স্থাপন করা হয় জানুয়ারিতে। এখন পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃষ্টি করা হয়নি। কোনো যন্ত্রপাতিও বরাদ্দ মেলেনি। বগুড়া ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে আসা আগুনে পোড়া ও অ্যাসিডে ঝলসানো রোগীর চিকিৎসা চলছে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে। এখানে আলাদাভাবে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট না থাকায় বেশি খারাপ রোগীকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়।

ভাগ