নামে-বেনামে টিটি কলেজ, টাকায় বিক্রি হচ্ছে বিএড সনদ

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ভুয়া শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটি কলেজ) সয়লাব রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অলিগলি। শিক্ষক প্রশিক্ষণ সনদের আশায় এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় এই সব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে উচ্ছেদ করা হলেও বিভিন্ন নামে-বেনামে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় নতুনভাবে আবার সেগুলো গজে উঠছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনুমোদন না নিয়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বসতবাড়িতে টিটি কলেজ গড়ে উঠছে। সেখান থেকে দেয়া হচ্ছে বিএড কোর্সের ডিগ্রি। এর মধ্যে একটি হলো নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডে মাদানী নগর এলাকায় মর্নিং সান কেজি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আলী আজম তার স্কুলের মধ্যে ‘আইডিয়াল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ’ নামে একটি টিটি কলেজ গড়ে তুলেছেন।
উত্তরার ১২নং সেক্টরের হামিদা আক্তার নামে এক ব্যক্তি গড়ে তুলেছেন পারসেপশন ক্যারিয়ার সেন্টার। যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল ক্যাম্পাসে ‘প্রাইম টিটি কলেজ’, যাত্রাবাড়ি দনিয়ায় বর্ণমালা স্কুলে শেরেবাংলা টিটি কলেজের শিক্ষক ফয়জুন্নেছা বেনামে দুটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ সেন্টার চালান। আজিমপুরে মহানগর টিটি কলেজ, চাঁদপুরে সেকান্দার টিটি কলেজ, জুরাইন আদর্শ হাইস্কুলে, ভূলতা গোলাকান্দাইল বিদ্যানিকেতন কিন্ডারগার্ডেন স্কুলের মধ্যে বিএড সনদ বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। চোখ ঝলসানো বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। জানা গেছে, উল্লেখিত অবৈধ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের রাজধানীর বিভিন্ন বৈধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা ও টাকার বিনিময়ে সনদ দেয়া হয়ে থাকে। তার মধ্যে মিরপুরের ফজিলাতুন্নেছা টিটি কলেজ, ধানমন্ডির প্রাইম টিটি কলেজ, মহানগর টিটি কলেজ, পল্লবীর শেরেবাংলা টিটি কলেজ, বিজয় নগর বধির স্কুলে পরিচালিত কলেজ অব এডুকেশন ও নীলক্ষেতের নিউ রাজধানী টিটি কলেজের নাম উঠে এসেছে। এইসব অবৈধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে বিএড করতে ক্লাস-পরীক্ষা, টিচিং প্রাকটিস, লেসনপ্ল্যান, অ্যাসাইনমেন্ট ও টার্ম পেপার কোনো কিছুরই প্রয়োজন হয় না বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরিতে প্রাইম টিটি কলেজের ঠিকানা ধানমন্ডিতে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে ধানমন্ডিতে এই কলেজের কোনো অস্তিত্ব নেই। হোম সার্ভিসের মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করায়। ক্লাস-পরীক্ষা কিছুই লাগে না এখানে। ফাইনাল পরীক্ষার সময় কোচিং সেন্টারের রুম ভাড়া করে শুধু ভাইবা পরীক্ষাটাই নেয়া হয়। টাকা দিলে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। কলেজের অধ্যক্ষ মোজাহিদ মওলানাকে অনেকবার ফোন করলে তার সহকারী জানান তিনি বাহিরে আছেন। কখন আসবেন জানেন না বলে ফোন রেখে দেন। এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ সনদ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে বলেও জানা যায়। জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড কোর্সের ডীন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক আগে থেকে ভুয়া টিটি কলেজ গজে উঠেছে। এগুলো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষক ছাড়াই শিক্ষার্থী ভর্তি, পরীক্ষা ও সার্টিফিকেট বিতরণ করে থাকে। আমরা নানা ভাবে চেষ্টা করে অনেকগুলো বন্ধ করে দিয়েছি। এদের কেউ কেউ আবার আদালতের নির্দেশ এনে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এ কারণে সার্টিফিকেট বিক্রি করা সম্ভব নয়। তবে কিছু টিটি কলেজ শিক্ষক ও অবকাঠামো ছাড়া চলছে।’ আমাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ এলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে রাজধানীর ফার্মগেটের বাংলাদেশ টিটি কলেজের অনুমোদন ছাড়াই বিএড কোর্সের ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ছাত্র জানান, ‘কলেজের অধ্যক্ষ জান্নাতুন নাহার টাকার বিনিময়ে বিএড সনদ বিক্রি করছেন। টাকা দিলেই সব মেলে এই কলেজে।’ এ ঘটনার তথ্য পাওয়ার পর কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়া হলেও আবারও সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি করা করানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার মন্নুজান বেগম। এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ জান্নাতুন নাহার জানান, ‘প্রতিষ্ঠানের বৈধতা পেতে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছেন।’ এখানে সার্টিফিকেট বিক্রি করার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ গোলাম ফারুক বলেন, টিটি কলেজের নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ থাকায় শিক্ষকদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএড করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। তবে যে সকল বৈধ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে কোনো সমস্যা নেই বলেও জানান তিনি।