লোকসমাজ ডেস্ক॥ আমি আমার কাজগুলোকে ভাগ করেছিলাম তিন ভাগে। স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্প মেয়াদ বলতে বেশ কয় সপ্তাহ, মধ্য মেয়াদ বলতে কয়েক বছর আর দীর্ঘ মেয়াদ বলতে যত দিন সময় লাগবে ততদিন। খাতার একদম শেষদিকে আমি সেইসব সমস্যাগুলোই টুকে রাখতাম যা একা বা একটি দল নিয়ে হয়তো আমার সমগ্র ক্যারিয়ারেও সমাধান করতে পারতাম না। এটাই ছিল প্রধানতম কাজ। এখানেই আপনার দৃষ্টিকে বড় করতে হবে- শুধু রাজনৈতিক দিক দিয়ে নয়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেও। বিচার ব্যবস্থায় প্রধান সমস্যাগুলো নতুন নয়। চিন্তাবিদ, কর্মী এবং রাজনৈতিক নেতারা এই পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য লড়ছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
আমি খুব ছোট থেকেই পরিবর্তনের লড়াইয়ে থাকা এমন মানুষদের দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমরা এই সমস্যাগুলোকে তালিকায় রেখেছি এর কারণ এই নয় যে, এগুলো নতুন। আসল কারণ হচ্ছে এগুলো বড়। মানুষ এর বিরুদ্ধে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লড়াই করছে। এখন এই সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব তোমার। আসল কাজ হচ্ছে আমার ভাগে যে দৌড়টুকু পড়েছে আমি তা কীভাবে দৌড়াবো? এই চেতনাটি আমার মা আমার মধ্যে দিয়েছিলেন। নাগরিক অধিকার এবং সমতার জন্য যারা লড়ছেন এমন মানুষদের সঙ্গেই আমি বড় হয়েছি। আমি দেখেছি আমার মা-ও ছিলেন এই লড়াইয়ে। আমার মা ছিলেন ব্রেস্ট ক্যান্সার গবেষক। অন্য সকল সহকর্মীদের মতো তিনিও চাইতেন এই রোগের প্রতিষেধক একদিন তৈরি হবে। কিন্তু তা কবে হবে তা নির্দিষ্ট করতে না পারলেও তিনি সব সময় কাজ করে গেছেন এর জন্য। যত দিন যেতে লাগলো তিনি ঘনিষ্ঠভাবে এ নিয়ে কাজ করতে লাগলেন। তা চলতে থাকলো দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, যতদিন না এর শেষ দেখা যায়। তোমার কাজ হচ্ছে সামনের দিকে দেখা তাহলে তোমার পেছনে যারা আছে তারাও তোমাকে অনুসরণ করবে। শক্তিশালী ও মজবুত ঐক্য গড়তে এটাই ছিল আমার প্রেরণা। ইতিহাসে আমরা কীভাবে স্থান করে নেব সেটি নির্ভর করছে আমাদের ওপরই। বিচার ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং অধিক কার্যকরী করার জন্য পাহাড় সমান কাজ বাকি রয়েছে। আমরা জানি সমস্যা কোথায়? সুতরাং লক্ষ্য ঠিক করে এখনই কাজে নামা দরকার। সিনেটে যোগ দেয়া প্রথম বছরেই আমার কাজের মূল ফোকাস ছিল দেশের জামিন ব্যবস্থা নিয়ে। যাকে আমরা মুক্ত করে দেব তার বিচার চলাকালে কেন তাকে কারাগারে থাকতে হবে। আমাদের দেশে একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে স্বীকৃত হবেন ততক্ষণ না পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়। যদি কেউ সমাজের জন্য বিপজ্জনক না হয় কিংবা বিচার এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে বিচারের দিন পর্যন্ত তার জেলে বসে থাকার কোনো অর্থ হতে পারে না। যতক্ষণ না বিচারক তোমাকে অভিযুক্ত করছেন বা তোমার বিরুদ্ধে কোনো রায় না দিচ্ছেন ততক্ষণ নিজের সম্মানের ওপর টিকে থাকা। এ কারণেই এ ধরনের জামিনের পক্ষে কাজ করে ‘বিল অব রাইটস’। ন্যায়বিচার আসলে দেখতে এমনই হওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পদ্ধতি পুরোপুরি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। গড়পড়তা জামিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আদালতকে দশ হাজার ডলার দিতে হয়। কিন্তু একজন আমেরিকানের মাথাপিছু আয় হচ্ছে ৪৫ হাজার ডলার। গড়ে মাথাপিছু সঞ্চয় হচ্ছে দু’হাজার পাঁচশত তিরিশ ডলার। ফলে প্রতি দশজনের নয়জনই দশ হাজার ডলার জমা রেখে জামিন আদায় করতে ব্যর্থ হয়। আমাদের বিচারব্যবস্থার কাঠামোটি এরকম যে, এটি ধনীরা পার পেয়ে যায় এবং গরিবরা শাস্তি পায়। কেউ যদি টাকা পরিশোধ করতে পারে সে আদালত থেকে মুক্তি পায়। যখন বিচার শেষ হয়ে যায় তখন তুমি তোমার টাকা ফেরত পাবে। তুমি যদি এই টাকা না দিতে পারো তোমাকে হয় জেলে থাকতে হবে অথবা তোমাকে তা পরিশোধে কর্জ করতে হবে। যার সঙ্গে তোমাকে দিতে হবে সুদ যা তুমি কখনই ফিরে পাবে না।
কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি ‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে





