আজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস : দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ

তহীদ মনি ॥ দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যশোরের বিশিষ্ট জনেরা। তাদের মতে, মুখে মানবাধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে নেই। মানবাধিকার এখন ভুলুষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে দৈনিক লোকসমাজে দেয়া সাক্ষাতকারে তারা এমন মন্তব্য করেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আমিরুল আলম খানের মতে মানবাধিকার বিবেচনায় সারা পৃথিবীর অবস্থা খারাপ। আর বাংলাদেশে তো মানবাধিকার নেইই। কারণ, এদশে নাগরিক অধিকারই নেই। নাগরিকদের নিয়েই মানবাধিকার। নাগরিক অধিকার না থাকলে মানবাধিকার থাকে কীভাবে ? তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কাউকে খুন করা বা খুনের হুমকি দেয়া ছাড়া সকল বিষয়ের সমালোচনা করা যায়, নিজের মত উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু এখানে ৫৭ ধারার মতো বর্বর আইন রয়েছে, কথা না বলতে দেয়ার জন্যে অসংখ্য আইনবিধি নির্দেশনা তৈরি হয়েছে। এমনকি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কী লেখা যাবে বা যাবে না তাও নির্ধারণ করছে সরকারি নির্দেশনা। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন না করে একজন নাগরিক সব ধরনের কথা বলার অধিকার রাখে। কিন্তু আমরা সরকার বা সরকারি নীতি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি না। এটা কোনভাবেই মানবাধিকার সংরক্ষণ করে না।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) যশোর জেলার সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনীতি ভালো থাকলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক অবস্থা যদি সঠিক নীতি ও আদর্শে চলে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে না। এসব বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার নেই। যেখানে বাক-স্বাধীনতা রুদ্ধ, রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণœ,সামাজিক অধিকার উপেক্ষিত, রাষ্ট্রকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে জনমত প্রতিফলিত হয় না এবং জনগণ তার প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষমতা বা দায়িত্ব পায় না সেখানে মানবাধিকার কোথায় থাকে ? প্রসঙ্গক্রমে তিনি আমেরিকার উদাহারণ টেনে বলেন, সেটিকে গণতন্ত্রের দেশ বলা হলেও সেখানে নিজেদের জন্যে এক নীতি আর বিশ্বের অন্যে দেশের জন্যে আরেক নীতি মানা হয়। তিনি বলেন, ভাত খাওয়ার জন্যে পাঁচটি আঙ্গুল দরকার হয়। লিখতে গেলে তিনটি আঙ্গুল লাগে। আর বর্তমানে এদেশে এক আঙ্গুলে কাজ চালানোর নীতি চালু হয়েছে। প্রায় সবক্ষেত্রেই এক আঙ্গুলের নির্দেশ বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিফলিত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে, আমি দুর্নীতি করবো, কিন্তু অন্যরা কেউ করতে পারবে না। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, সারাজীবন মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেছি। প্রশাসনের খামখেয়ালি কাজের বিরুদ্ধে কথা বলা যেমন সামাজিকভাবে হেনস্তা হতে হয়েছে, তেমনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়েছে। আমার ছেলেকে যশোর থেকে তুলে নিয়ে খুলনার ফুলতলায় মাদকসহ থানায় দিয়ে মামলা করা হয়েছে। এখন সেই নিরীহ ও শিক্ষার্থী ছেলের নামে মাদক, বোমাবাজিসহ চারটি মামলা করা হয়েছে। এখন সেই নীরিহ ও শিক্ষার্থী ছেলের নামে মাদক, বোমাবাজিসহ চারটি মামলা রয়েছে। মানবাধিকারের এর চেয়ে ‘উজ্জ্বল‘ দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে ? তার মতে, কথা বলা মানেই নতুন বিপদ। এখন কথা বললেই রেহাই পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, মানবাধিকার মানেই অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা চিকিৎসা, বিচার পাওয়া সবকিছু জড়িত। অথচ, এসব ক্ষেত্রই আজ চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত অথবা কালো থাবার শিকার। সুশাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করা, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাহিদা মেটানোই মানবাধিকার অথচ, অন্য সব দূরে থাক, এখানেই মানুষ কথা বলার অধিকার পায় না। বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনীতিক অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেছেন, এদেশে কোথাও মানবাধিকার নেই। যে দেশে নারী-শিশু ধর্ষিতা হয়, ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে, দিনের পর দিন। জেল-জুলুম, গুম, হত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, যেখানে মানুষ সরকারের কোন কাজের সমালোচনা বা আলোচনা করতে পারে না। সেখানে কোন অবস্থায়ই মানবাধিকার থাকে না। বাক-স্বাধীনতা তো নেই। মানুষের ভোট দেয়ার অধিকারও নেই। প্রশাসন যন্ত্র ব্যবহার করে রাতের আঁধারে ভোট নিয়ে নেয়া হয়, সেদেশে মানবাধিকার কোথায় ?
সাংস্কৃতিক সংগঠক বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল বলেছেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি এক কথায় দুর্ভাগ্যজনক। স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশে বর্তমান পরিস্থিতি পুরো জাতির জন্য এক অপ্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছেছে। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সব জায়গাই সমস্যাপূর্ণ।

ভাগ