মাস্ক: দ্বিগুণ শাস্তি নয় দরকার আইনের সঠিক প্রয়োগ

লোকসমাজ ডেস্ক॥ শীতে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ইতিমধ্যে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার এবং প্রশাসন। হচ্ছে গুচ্ছাকারে নিয়মিত অভিযান। ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত মাস্ক ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করলেও পুরোপুরি মানানো যাচ্ছে না। সরজমিন বিভিন্ন গণপরিবহন, কাওরান বাজার, বাংলামোটর, ফার্মগেট, নিউমার্কেট এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র। জরিমানার ভয়ে মাস্ক সঙ্গে রাখলেও সেটা কেউ পকেটে, কানে অথবা চিবুকে ঝুলিয়ে রাখছে। সরাসরি মাস্ক পরছে না অনেকেই। মিরপুর থেকে মতিঝিলগামী বিআরটিসি বাসের হেলপার মেহেদী। মুখে না পরে মাস্ক কেন কানে ঝুলিয়ে রেখেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশিক্ষণ মাস্ক পরে থাকলে ঠোঁট এবং গলা শুকিয়ে যায়।
যাত্রীদের ভালোভাবে ডাকতে পারি না। তাই মাঝেমধ্যে খুলে কানে অথবা পকেটে রাখি। গাবতলী লিংক পরিবহনের যাত্রী মানসুরা বেগম। রাজধানীর একটি হাসপাতালে আয়ার কাজ করেন। একটু পরপর হাত স্যানিটাইজ করলেও মুখে মাস্ক নেই। মুঠোফোনে করোনা থেকে সাবধান এবং সচেতন থাকতে পরিবারের সদস্যদের বারবার তাগিদ দিচ্ছেন। মানসুরা বলেন, হাসপাতালে সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে হয়। ডিউটি শেষে বাসায় ফিরছি। সাইট ব্যাগে মাস্ক রাখা আছে। নামার সময় পরে নেব।
ফার্মগেটের ফুটপাথে পোশাক ব্যবসায়ী শাকিল বলেন, সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকা যায় না। মাঝেমধ্যে পরি। তাছাড়া মাস্ক পরে ক্রেতাদের ডাকলে আকৃষ্ট হয় না। অনেক সময় দাম কতো, পোশাকের কোয়ালিটি ইত্যাদি শুনতে না পেয়ে চলে যায়। এ কারণে কখনো কখনো মুখ থেকে খুলে মাস্ক চিবুকে ঝুলিয়ে রাখি। নিউমার্কেটের ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটের এক ব্যবসায়ী নাম না বলার শর্তে বলেন, এমনিতেই তেমন ক্রেতা নেই। গ্রামে পুরোপুরি শীত বাড়লেও শহরে এখনো ফ্যান চালাতে হয়। শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে। করোনায় দোকানের কর্মচারী কমিয়েছি। তাই নিজেকেই বেশি সময় থাকতে হয়। বেশিক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে পারি না। তাছাড়া ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার একটি বিষয় রয়েছে। ভালোভাবে মুখ দেখতে না পেলে অনেক সময় ক্রেতা চলে যায়। মাস্ক পরা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ দেশের সর্বত্রই কম বেশি অভিযান চলছে। এসব অভিযান পরিচালনা করছে বিভিন্ন সংস্থার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ। নিয়মিতভাবে চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে আরো কঠোর হচ্ছে প্রশাসন। চলছে ব্যাপক অভিযানের প্রস্তুতি। এ বিষয়ে র‌্যাব এবং ডিএমপি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে মানুষকে জরিমানা বা সামাজিকভাবে হেয় করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতাই আমাদের মূল লক্ষ্য। পূর্বের তুলনায় মাস্ক ব্যবহার বেড়েছে। কিছু মানুষ রয়েছে যারা নামমাত্র মাস্ক পরলেও সেটি হয় কানে অথবা চিবুকে ঝুলিয়ে রাখছে। কেউ কেউ ব্যাগে এবং পকেটে রাখছে। এক্ষেত্রে কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে প্রশাসন। স্বাভাবিক জরিমানার চেয়ে তাদের জরিমানা দ্বিগুণ করা হচ্ছে- এমনটিই নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ বিষয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, মূলত আমরা যে ধরনের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকি এটার প্রথম এবং প্রধান উদ্দেশ্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। কাউকে শাস্তির আওতায় এনে জরিমানা করা আমাদের লক্ষ্য নয়। মূল লক্ষ্য হচ্ছে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। যাতে তারা স্বাস্থ্যসেবা মেনে চলে। এ লক্ষ্যে আমরা আগামীতেও জোরদার কার্যক্রম পরিচালনা করবো। নিশ্চয় জানেন, আগামীতে জরিমানা দ্বিগুণ হওয়ার একটি প্রক্রিয়া আছে। সুতরাং এক্ষেত্রেও আমরা তাদের অবস্থান বিবেচনা করবো। কিন্তু র‌্যাবের অবস্থান হচ্ছে শাস্তির চেয়ে মানুষকে সচেতন বেশি করা। করোনাবিরোধী অভিযান এটা কেবলমাত্র সরকারি অভিযান নয়, প্রত্যেকটি মানুষের ব্যক্তিগত অবস্থান থেকেও তাদেরকে সচেতন হওয়াটা খুবই জরুরি। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ওয়ালিদ হোসেন বলেন, এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা আছে। সে অনুযায়ী ডিএমপি’র ম্যাজিস্ট্রেট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসকসহ সকলেই নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এতো পর্যাপ্ত সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের নেই। এক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সাজা দেয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন আছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গেলে মাস্ক না পরলে আমরা সেবা দিচ্ছি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো কমিউনিকেশন অর্থাৎ জনগণকে সচেতন করা। পাশাপশি যে কথাটা বলা আছে সেটা হলো কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বা জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো। আমরা সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। কিন্তু জনসম্পৃক্ততাটা করতে পারিনি। জনগণকে সচেতন এবং সম্পৃক্ত করা এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সম্পৃক্ত করার প্রথম ধাপ হচ্ছে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা। বুঝিয়ে, মোটিভেট করে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা। এবং এ জায়গাটিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে। এখন রাষ্ট্রকে যেটা করতে হবে এলাকাভিত্তিক জনগণকে সম্পৃক্ত করা। প্রতিটি ওয়ার্ড বা মহল্লায় যাতে জনগণ সম্পৃক্ত হয়। তারা নিজেরা মাস্ক পরবে এবং অন্যকে পরতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ছাড়া মাস্ক না পরলে যেই সমস্যাগুলো হয় সেগুলো সম্পর্কে সচেতন করবে। সরকারকে এখন যে কাজটি করতে হবে এলাকা বা ওয়ার্ড ভিত্তিক জনগণকে সচেতন করা। আর আইনের সঠিক প্রয়োগ ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযানের মাধ্যমে হবে না। বিট পুলিশ এবং থানা পুলিশকে সম্পৃক্ত করতে হবে আইনটিকে যাতে সঠিকভাবে তারা প্রয়োগ করে। আইনের সঠিক প্রয়োগ, জনগণ সচেতন এবং জনগণ সম্পৃক্ত হওয়া এই তিনটি একসঙ্গে করলেই আমরা এটাতে সফল হবো। অন্যভাবে নয়।

ভাগ