স্টাফ রিপোর্টার॥ যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে আট কিশোর অপরাধী পালিয়েছে। কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন জানান, একই কক্ষে অবস্থানকারী ওই কিশোরেরা জানালার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে গেছে। সম্প্রতি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সর্বক্ষণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য দায়ি আট কিশোরকে কেন্দ্রের দর্শনার্থী কক্ষের সাথে লাগোয়া একটি কক্ষে ‘স্পেশাল কোয়ারেন্টাইনে’ রাখা হয়েছিল। ওই কক্ষের জানালার গ্রিল ভেঙে পালিয়েছে ওই আট জন। গত ১৩ আগস্ট দেশের বালক এ শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার পর আট জন পালিয়ে যাওয়ার এ ঘটনা চরম অব্যবস্থাপনার নজীর বলে গতকাল সরকারি বিভিন্ন দফতরে আলোচিত ছিল। আলোচিত এ ঘটনার পর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র ও এর নিয়ন্ত্রণক প্রতিষ্ঠান সমাজ সেবা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন।
থানা সূত্রে জানা যায় পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা হলো, ১৯৯৭ সালে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি থানায় দায়েরকরা একটি হত্যা মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি কাশিয়ানী উপজেলার পুইশুর গ্রামের বাদশা শিকদারের ছেলে শাহ আলম শিকদার (১৫), চলতি বছরের জুলাই মাসে যশোর কোতয়ালি থানায় দায়েরকরা একটি হত্যা মামলার আসামি শহরের পুরাতন কসবা বিবি রোডের ফারুক হোসেনের ছেলে ফারদিন দুর্জয় (১৫), চলতি বছরের অক্টোবর মাসে খুলনা সদর থানায় দায়েরকরা একটি চুরির চেষ্টা মামলার আসামি খুলনার লবরচোরা এলাকার মৃত হাফিজ গাজীর ছেলে রোহান গাজী (১৪), চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নড়াইল সদর থানায় দায়েরকরা একটি চুরি মামলার আসামি নড়াইল সদর উপজেলার চাকই গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মুন্না গাজী (১৪), চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বরিশালের কাউনিয়া থানায় দায়েরকরা একটি চুরি মামলার আসামি কাউনিয়া উপজেলার আটহাজার মুন্সিবাড়ির মৃত মোস্তফা মুন্সির ছেলে মাইনুর রহমান সাকিব (১৫), ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে যশোরের শার্শা থানায় দায়েরকরা একটি হত্যা মামলার আসামি যশোর সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা আদর্শপাড়ার ফারুক হোসেনের ছেলে হৃদয় (১৭), চলতি বছরের জুলাই মাসে খুলনা সদর থানায় দায়ের করা একটি চুরির চেষ্টা মামলার আসামি যশোর শহরের চৌরাস্তা এলাকার কাশেম মোল্লার ছেলে আব্দুল কাদের (১৪) এবং ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে খুলনার দৌলতপুর থানায় দায়েরকরা একটি মাদক মামলায় দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি দৌলতপুর রেলিগেট রেল কলোনি এলাকার মায়ার বাড়ির পাশের মৃত মতি হাওলাদারের ছেলে মতি শেখ (১৬)।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন জানান, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র থেকে দেখা গেছে রবিবার দিবাগত রাত ২টা ১৫ মিনিটের দিকে তারা পালিয়ে যায়।
যশোরের পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন জানান, কক্ষের দুর্বল জানালার কারণে পালিয়েছে ওই আট কিশোর। অতিরিক্ত উচ্ছৃঙ্খলার কারণে এই আট জনকে একটি কক্ষে স্পেশাল কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। কক্ষের জানালার গ্রিলগুলো খুবই দুর্বল। ওই গ্রিল ভেঙে বিদ্যুতের কাজের জন্য ব্যবহৃত মই বেয়ে উচু প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে তারা পালিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, এই মইগুলো সাধারণত শিকল দিয়ে তালাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ঘটনার রাতে একটি মই তালা দেওয়া ছাড়াই ছিল। পুলিশ সুপার আরও জানান, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোর হত্যাকান্ডের পর থেকে কিশোরদের পালানো ঘটনা বেড়েছে। অতিসম্প্রতি তিন দফা পালানো ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশ অবহিত হয়ে তাদের উদ্ধার করে আনে। তিনি জানান, গত ৩/৪ দিন আগে তিন কিশোর কেন্দ্রের সুয়ারেজ লাইনের ড্রেন দিয়ে পালিয়ে যায়। এছাড়া গাছ বেয়ে, ছাদ থেকে লাফিয়েও পালানো চেষ্টা করেছে কিশোররা।
এদিকে কেন্দ্রে অবস্থানকারী কিশোর অপরাধীদের মধ্যে যারা বেশি উচ্ছৃঙ্খল তাদের পলায়নের এ ঘটনা নিয়ে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের দুর্বল ব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে। ওই দিন কেন একটা মইয়ে তালা দেয়া হল না। এবং তার যে ভবনে ছিল তা কেন্দ্র থেকে বেরুনোর রাস্তার অর্থাৎ প্রধান ফটকের আগে ডান পাশে। এর বিপরীত পাশে রয়েছে পুলিশ ও আনসারদের ব্যারাক। সাধারণ পুলিশ ও আনসারদের দায়িত্ব প্রধান গেট থেকে শুরু করে কেন্দ্রে সীমানার নিরাপত্তার। কিন্তু কিশোররা জানালা ভেঙে বড় মই নিয়ে প্রাচিরে উঠে বাইরে লাফ দিয়ে নামলো অথচ পুলিশ বা আনসারদের কেউ বুঝতে পারলো না।
একাধিক সূত্র বলছে, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের এসব অনিয়ম দীর্ঘদিনের। কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উদাসীনতা, অনিয়ম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় এর জন্য বড় দায়ি বলে তারা জানান। গত ১০ বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রটিতে ৫ দফা বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট আকাশ (১২) নামে এক শিশুকে প্রথমে শ্বাসরোধ ও পরে টিনের টুকরো দিয়ে গলাকেটে হত্যা করা হয়। নিহত আকাশকে ২০০৭ সালে চুয়াডাঙ্গা থেকে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের ৩০ জুন কেন্দ্রে বন্দি থাকা নূর ইসলাম (১৫) নামে এক শিশু আত্মহত্যা করে। নূর ইসলামকে চুরির মামলায় ওই বছরের ২২ মে গাইবান্ধা থেকে যশোর পাঠানো হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৪ সালে ৫ মে কেন্দ্রে বন্দিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েক কিশোর ভাঙা কাঁচ দিয়ে শরীর কেটে প্রতিবাদ ও ােভ জানায়। দর্শনার্থী একজন অভিভাবককে মারধরের অভিযোগের জের ধরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই সময় বন্দি কিশোররা কেন্দ্রে ভাঙচুর ও পুলিশের ব্যারাকে হামলা চালায়। এরপর গত ১৩ আগস্ট কেন্দ্রের মধ্যে পিটিয়ে তিন কিশোরকে হত্যা করে কর্তৃপক্ষ এ সময় আহত হয়েছে আরো ১৫ কিশোর। সর্বশেষ গতকাল ৮ বন্দি শিশু রাতের আধারে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়া শিশুদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ বলে জানান কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক জাকির হোসেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন হবে কিনা সে বিষয়ে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানেন। এ বিষয়ে জানতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক অসিত কুমার সাহার সাথে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সকাল থেকেই তিনি তার দফতরে ছিলেন না এবং সাংবাদিকদের ফোন গ্রহণ করেননি।
এদিকে রাতে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজ উদ্দীন খান বলেন, পালিয়ে যাওয়া ৮ শিশুর মধ্যে সোমবার দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, এর আগে তিন জন পালিয়ে গেলেও তাদেরকে পরবর্তিতে উদ্ধার করা হয়। তবে এ বিষয়ে রাতে যশোর কোতয়ালী থানার ওসি মনিরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, শুনেছি পালিয়ে যাওয়া ৮ শিশুর মধ্যে দুই শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর অবস্থান বর্তমান কোথায় সে বিষয়ে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে পুলিশকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান। কোতয়ালি থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) শেখ তাসমীম আলম জানিয়েছে, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে শিশু পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কোতয়ালি থানায় একটি জিডি করেছেন যশোর সমাজ সেবা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক। জিডি নম্বর-৩৭০। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে আটক করা যায় নি। এর আগে গত ১৩ আগস্ট তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১৮ বন্দি শিশুর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এতে তিন শিশু নিহত হয় এবং ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই ঘটনায় ৫ কর্মকর্তা ও ৭ বন্দি শিশুর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ঘটনাটি দুইটি উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত কমিটি তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পায়। এই ঘটনায় দায়েরকরা মামলা এখনো তদন্তাধীন।





