উপকূলজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনায় দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা

মো.জামাল হোসেন, খুলনা॥ খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় অনলাইন কাস থেকে দূরে সরে আছে শিক্ষার্থীরা। সরকার টেলিভিশনে রেকর্ড করা কাস সম্প্রচার করছে, সেখানেও উপস্থিতি ভালো নয়। সব মিলিয়ে পড়াশোনা ও পরীক্ষা ছাড়াই চলতি শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের একাংশ পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। সবমিলিয়ে করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীরা গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
সূত্র মতে, গত ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। সব মিলে নয় মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইনে কাস নেয়া হচ্ছে, তবে উপকূলের শিক্ষার্থীরা এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের অভিযোগ, গতিশীল মোবাইল টাওয়ার না থাকা ও প্রত্যন্ত গ্রামের অস্বচ্ছল পরিবার হওয়ায় এই পদ্ধতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে, শক্তিশালী মোবাইল নেটওয়ার্ক চেয়ে ‘দাকোপে গতিশীল মোবাইল টাওয়ার চাই’ নামে একটি প্লাটফর্ম গঠন করেছেন উপকূলের শিক্ষার্থীরা। সেখানে তারা নিজেদের সমস্যা উল্লেখ করে গতিসম্পন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক চেয়ে নানান ধরণের মন্তব্য পোস্ট করছেন। এই গ্রুপের সদস্য শিক্ষার্থী সৌরভ বিশ্বাসের বাড়ি দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউনিয়নের শ্রীনগর গ্রামে। তিনি চায়না জিংগাজ্ঞানসাং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের শিক্ষার্থী। করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে চীন থেকে জানুয়ারিতে গ্রামে চলে আসেন। মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা তুলে ধরে সৌরভ বিশ্বাস বলেন, প্রতিদিন কাস চলছে অনলাইনে, তবে দেশে এসে বড় দুশ্চিন্তায় পড়েছি। কাস করার সময় ল্যাপটপে ঠিকমত নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। বিকল্প কোনো ধরণের সুবিধা না থাকায় মোবাইলডেটা ব্যবহারই একমাত্র পন্থা। তিনি বলেন, কাস শুরু হলে ল্যাপটপ ও মোবাইল ডিভাইস নিয়ে রাস্তার পাশে বা উঁচু কোনো জায়গা খুঁজে বসে পড়াশোনা করতে হয়।
সুতারখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাজিরা খাতুন জানান, মুঠোফোন হাতে ধরে বসে থাকতে হয়। সঠিকভাবে কোথাও মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। ফলে কাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে অনেক সময় বাদ পড়ে যাচ্ছি। দুর্ভোগে পড়তে হয় সবসময়। উপকূলীয় বাজুয়া গ্রামের সরোজিৎ ম-ল নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসায়িক কাজে অনেক সময় বিভিন্ন জায়গায় মুঠোফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। কিন্তু এ অঞ্চলে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক বললেই চলে। মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে বিরক্ত হতে হয়। চুনকুড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার রায় বলেন, নিজের বাড়ি হরিণটানা গ্রাম থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ দূরে বাজুয়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পাঠদান করাতে হয়। অনেক সময় অনলাইনে শিক্ষাভিত্তিক আলোচনা থাকে। কিন্তু নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে বেশির ভাগ সময় বিষয়ভিত্তিক আলোচনা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মহামারী করোনাকালে শিক্ষার্থীরা যাতে না ঝরে পড়ে, সেক্ষেত্রে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই কার্যকরি। তবে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণে গতিশীল মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করা জরুরি ছিল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গ্রুপটির ফোকাল পার্সন অসীম ঘরামী বলেন, আমরা মূলত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করি। তারই অংশ হিসেবে করোনাকালীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইন মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাস ও শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল নেটওয়ার্ক। তিনি আরও বলেন, উপকূলজুড়ে গতিশীল মোবাইল টাওয়ার না থাকায় শিক্ষার্থীদের কাস করতে নানান ধরণের সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। এজন্য প্রথমে আমরা আলোচনা করে অনলাইনভিত্তিক একটি প্লাটফর্ম গঠন করেছি। সেখানে আমাদের দাবি, প্রযুক্তির ব্যবহার করে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের কাস নেয়ার আগে প্রযুক্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে উপকূলের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির মাধ্যমে সকল কাজে অংশ নিতে পারবেন। শিক্ষাবিদদের ধারণা, উপকূলীয় এলাকাগুলোর জন্য রয়েছে বেসরকারি মোবাইল টাওয়ার। কিন্তু সেগুলো পর্যাপ্ত গতিসম্পন্ন নয়। টাওয়ারগুলো গতিশীল করতে পারলে করোনাকালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তারা বলছেন, শহরের স্বচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা এমনিতেই পড়াশোনায় এগিয়ে থাকে। করোনা পরিস্থিতিতে তারা কাস ও পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছে অনলাইনে। শহর ও গ্রামের নি¤œবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সে সুযোগ পাচ্ছে না। সরকার গত ২৯ মার্চ থেকে মাধ্যমিকের এবং ৭ এপ্রিল থেকে প্রাথমিকের রেকর্ড করা কাস সংসদ টেলিভিশনে প্রচার করছে। কিন্তু টেলিভিশনের কাস খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না।

ভাগ