যশোরে বেড়েছে ইজিবাইক চুরি, চক্র চিহ্নিত হলেও শঙ্কামুক্ত নন চালকেরা

মীর মঈন হোসেন মুসা ॥ যশোর শহরের শংকরপুর ইসহাক সড়কে ইজিবাইক রেখে খালুশ্বশুর বাড়িতে দুপুরে খাবার খেতে গিয়েছিলেন চালক ফিরোজ আহমেদ। আধাঘণ্ট পর ফিরে এসে দেখেন, ইজিবাইকটি নেই। তালা ভেঙে চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। অলিয়ার রহমান নামে আরেকজন চালক দুপুরে শহরের কাঠেরপুলের পাশে ইজিবাইক রেখে কাঁচাবাজারে ঢুকেছিলেন তরকারি কেনাকাটার জন্য। ফিরে এসে দেখেন, ইজিবাইকটি উধাও। শুধু চুরি নয়, প্রতারণাসহ নানা কৌশলে দুবর্ৃৃত্তরা ইজিবাইক নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। সম্প্রতি যশোর থেকে এভাবে বেশ কয়েকটি ইজিবাইক চুরি হয়েছে। চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ইজিবাইকের মালিক ও চালকেরা। ইতোমধ্যে যশোরের ডিবি পুলিশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে ওই চোর ও প্রতারকচক্রের ১২ জন সদস্যকে আটকও করেছে। তাদের আস্তানা থেকে চোরাই ২৬টি চোরাই ইজিবাইক উদ্ধার হয়েছে। তারপরও বন্ধ হচ্ছে না ইজিবাইক চুরির ঘটনা।
যশোরে ইজিবাইক শ্রমিকদের সংগঠন অটোবাইক শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম হোসেন জানান, একটি ইজিবাইকের বর্তমান মূল্য পৌনে ২ লাখ টাকা। যারা ইজিবাইক কিনে ভাড়া দিয়ে থাকেন তারা সকলেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির। আবার কেউ কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে অথবা সহায় সম্বল বিক্রি করে ইজিবাইক কিনে নিজেরা চালিয়ে থাকেন। এই ইজিবাইকের ওপর নির্ভরশীল মালিক ও চালকের দুটি পরিবার। কিন্তু যশোরে হঠাৎ ইজিবাইক চুরি বেড়ে যাওয়ায় তারা সকলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আয়ের একমাত্র সম্বল হারিয়ে অনেক মালিকের এখন কষ্টে সংসার চলছে। চালকেরাও বিপদের মধ্যে আছেন। তিনি জানান, মাত্র দুই মাসে ১২টি ইজিবাইক চুরির ঘটনায় তিনি মালিক ও চালকদের কোতয়ালি থানায় অভিযোগ করতে সহায়তা করেছেন। এর বাইরেও হয়ত আরও ইজিবাইক চুরির ঘটনা ঘটেছে, যা তিনি অবহিত নন।
চালকদের সূত্রে জানা যায়, ইজিবাইক চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। গত ১৮ নভেম্বর রাতেও যশোরে আরেকটি ইজিবাইক চুরি হয়েছে। শহরের বেজপাড়া বিহারীপাড়া এলাকার এক ব্যক্তি কোতয়ালি থানার পেছন এলাকায় ইজিবাইক রেখে পাশে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখেন, ইজিবাইকটি চুরি হয়ে গেছে। সূত্র জানায়, শুধু চুরি নয়, নানা প্রতারণার মাধ্যমে তাদের ইজিবাইক নিয়ে চম্পট দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা।
কেশবপুর উপজেলার ভবতি গ্রামের মৃত মোজাম সিকদারের ছেলে সাইফুল ইসলাম জানান, যশোর শহরের রেল রোড চারখাম্বার মোড়ে তার কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ইজিবাইক নিয়ে চম্পট দিয়েছেন এক প্রতারক। ওই ইজিবাইকের মালিক শহরের বারান্দীপাড়ার আব্দুল ওহাব নামে এক বৃদ্ধ। তার কাছ থেকে ইজিবাইক নিয়ে ভাড়ায় চালাতেন তিনি। গত ১৮ অক্টোবর দুপুরে বারান্দীপাড়া খালধার রোড থেকে একজন যাত্রী তার ইজিবাইকে করে রেল রোড চারখাম্বার মোড়ে আসেন। এ সময় একটি শপিং ব্যাগ তার হাতে ধরিয়ে পাশের গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাগ্নের কাছে পৌঁছে দিতে বলেন ওই ব্যক্তি। কিন্তু গলিতে গিয়ে কাউকে তিনি পাননি। পরে ফিরে এসে দেখেন, ওই ব্যক্তি তার ইজিবাইক নিয়ে চম্পট দিয়েছেন।
যশোরের ডিবি পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম পিপিএম বলেন, শুধু চুরি নয়, চালকদের চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে ইজিবাইক নিয়ে চম্পট দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ৩ মাস আগে তারা গোপালগঞ্জের গোলাবাড়িয়া ও কুষ্টিয়ার চৌড়হাস ফুলতলা এলাকায় আলাদা অভিযান চালিয়ে এই চক্রের তিন সদস্যকে আটক করেছেন। সদর উপজেলার জঙ্গলবাঁধাল গ্রামের একটি ভাড়া বাড়িতে রফিজ গাজী নামে একজন চালককে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে ওই চক্র তার ইজিবাইকটি নিয়ে গিয়েছিলো। মূলত এরই সূত্র ধরে গোপালগঞ্জ থেকে চক্রের দুই সদস্য ও কুষ্টিয়া থেকে আরেক সদস্যকে আটক করেন। এ সময় কুষ্টিয়ার ওই সদস্যের আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮টি চোরাই ইজিবাইক। আটক ওই ৩ প্রতারক হচ্ছেন-বরগুনার তালতলি উপজেলার মৃত ওহাব ফরাজীর ছেলে আলম ফরাজী ওরফে মহারাজ, যশোর সদর উপজেলার সীতারামপুর মধ্যপাড়ার মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে রবিউল ইসলাম ও কুষ্টিয়ার চৌড়হাস ফুলতলা এলাকার মৃত কুতুব উদ্দিনের ছেলে মিজানুর রহমান ওরফে মেজর।
ডিবি পুলিশের ওই কর্মকর্তা চালকদেরকে প্রলোভনে পড়ে দূরে কোথাও যাওয়া অথবা যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো খাবার না খাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোরে একাধিক ইজিবাইক চোরচক্র তৎপর রয়েছে। সুযোগ পেলেই চক্রের সদস্যরা ইজিবাইক নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। এমনকী চার্জের গোডাউনের তালা ভেঙে ইজিবাইক চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে চোরেরা। গত ২ অক্টোবর রাতে সদর উপজেলার সরদার বাগডাঙ্গা গ্রামের জনৈক নুর ইসলামের গ্যারেজের তালা ভেঙে এভাবে দুটি ইজিবাইক চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
ডিবি পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম পিপিএম জানান, নুর ইসলামের গ্যারেজ থেকে দুটি ইজিবাইক চুরির মামলা তদন্ত করতে গিয়ে যশোরে একাধিক চোরচক্র তৎপর এমন তথ্য পেয়েছেন। যশোরের এমন দুটি চোরচক্রের হোতা খুলনার হরিণটানা থানার কৈয়াবাজার জয়খালী এলাকার মৃত ইসমাইল হাওলাদারের ছেলে সুমন হাওলাদার। গত ৬ নভেম্বর তার আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৮টি চোরাই ইজিবাইক উদ্ধারসহ তাকে আটক করেন তারা। ওই ৮টি ইজিবাইকের মধ্যে দুটি নুর ইসলামের গ্যারেজের ভেতর থেকে চুরি হয়েছিলো বলে শনাক্ত হয়। তিনি বলেন, সুমন হাওলাদার ছাড়াও সেই সময় চোরচক্রের আরও ৭ সদস্যকে আটক করেন। এরা হচ্ছেন-যশোর সদর উপজেলার আমবটতলা এলাকার আব্দুল আজিজের ছেলে রাজু ওরফে বড় রাজু, শহরের শংকরপুর জমাদ্দারপাড়ার ইয়ার আলীর ছেলে শাহাদৎ, বেজপাড়া পানির ট্যাংকের পাশের মৃত মিজান শেখের ছেলে আনারুল ইসলাম, ধর্মতলা হ্যাচারিপাড়ার জাকির সরদারের ছেলে শাহিন, সদর উপজেলার নুরপুর দক্ষিণপাড়ার জামাল গাজীর ছেলে রবিউল গাজী, মনিরামপুর উপজেলার দোনার গ্রামের আশরাফ আলী বিশ্বাসের ছেলে সোহেল রানা ও খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার হাজিগ্রাম উত্তরপাড়ার বাবুল মোল্লার ছেলে রাজু মোল্লা। এছাড়া এই চক্রের আরেক সদস্য রাহুল হোসেনকে গত ১৮ নভেম্বর যশোর শহরের ঘোপ বেলতলা থেকে ডিবি পুলিশ আটক করে। রাহুল হোসেন ঘোপ বেলতলা এলাকার কামাল মেম্বারের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। ডিবি পুলিশের ওই কর্মকর্ত জানান, যারা স্পটে থেকে ইজিবাইক চুরি করে তারা বাইক প্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা করে পেয়ে থাকেন। চুরি করার পর চক্রের সদস্যরা ইজিবাইক মনিরামপুরে তাদের সহযোগী সোহেল রানার কাছে নিয়ে যান। আর সোহেল রানার দায়িত্ব খুলনায় চক্রের হোতা সুমন হাওলাদারের কাছে ইজিবাইক পৌঁছে দেয়া। সুমন হাওলাদার রঙ পরিবর্তন এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ৭০-৮০ হাজার টাকায় প্রতিটি বাইক বিক্রি করে থাকেন। ডিবি পুলিশ জানায়, তারা ইজিবাইক চোরচক্রের সদস্যদের আটকে কাজ করে যাচ্ছে। তবে ইজিবাইকের মালিক ও চালকদের এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।

ভাগ