খুলনা সংবাদদাতা॥ খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ সুপেয় পানি ও স্বাদু পানির ঘাটতি মারাত্মক। এর প্রভাবে কৃষি, স্বাস্থ্য, মৎস্য চাষ তথা মানুষের জীবন জীবিকা ও আর্থ সামাজিক অবস্থা এবং লোনা পানির বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে পানি সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলো অপরিসিম গুরুত্ব পাচ্ছে। এ বিবেচনায় খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় ১৮টি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ‘ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যাসেসমেন্ট ইন সাইথ-ওয়েস্ট কোস্টাল রিজিওন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি যৌথ গবেষণা প্রকল্প চালু হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বরে শুরু হওয়া এ গবেষণা চলবে আগামী ১৮ মাস।
খুলনার হোটেল ক্যাসল সালামে আয়োজিত একটি ইনসেপশন কর্মশালায় রবিবার (১৫ নভেম্বর) এ গবেষণা প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করা হয়। কর্মশালায় বলা হয়,পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট এই যৌথ গবেষণা আয়োজন করা হয়েছে। কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন ওয়ারপো মহাপরিচালক (অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি) মো. দেলওয়ার হোসেন। সভাপতিত্ব করেন কুয়েট আইডিএম পরিচালক প্রফেসর ড. মো. সাইফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ওয়ারপো পরিচালক (পরিকল্পনা) মো. আলমগীর হোসেন ও খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জিয়াউর রহমান। অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক প্রেজেন্টেশন উপস্থাপনা করেন কুয়েট আইডিএম সহকারী প্রফেসর ও দলনেতা এস এম তরিকুল ইসলাম। স্বাগত বক্তৃতা করেন ওয়ারপো পিএসও মো. একরাম উল্লাহ। অনুষ্ঠানে ১৮টি ইউনিয়ন থেকে জনপ্রতিনিধি, খুলনার সরকারি সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
বিষয়ভিত্তিক প্রেজেন্টেশন উপস্থাপনায় কুয়েট আইডিএম সহকারী প্রফেসর ও দল নেতা এস এম তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘চলমান গবেষণা প্রকল্পটির আওতায় মূলত খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার পানি সুরক্ষা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। শুরুতে খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় ৭টি উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে এ গবেষণা করার লক্ষ্য স্থিরি করা হয়েছে। ইউনিয়নগুলো হচ্ছে— খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লতা, গড়ইখালী, দেলুটি, সোলাদানা ও তীলডাঙ্গা ইউপি, দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ও সুতারখালী ইউপি,কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউপি,বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার কাওলিয়া ইউপি, শরণখোলা উপজেলার খোন্তাকাটা,ধানসাগর, রায়েন্দা ও দাখিন খালি ইউপি,সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউপি এবং শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ও গাববুনিয়া ইউপি।
কর্মশালায় জানানো হয়, প্রকল্পটির সামগ্রিক উদ্দেশ্য হলো— দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে পানি নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সূচকগুলোর একটি সেট তৈরি করা। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট তিনটি উদ্দেশ্য হচ্ছে— স্থানীয় পর্যায়ে পানির প্রাপ্ততা নিরূপণ ও পানির সহজলভ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাবগুলো চিহ্নিতকরণ, উপকূলীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ পানি গ্রহণের সামর্থ্য নিরূপণ, পানির গুণগতমান বিশ্লেষণ করা এবং স্থানভিত্তিক ও মৌসুমভিত্তিক পানির প্রাপ্যতা নির্ণয়করণ। প্রকল্পের গবেষণা ফলাফল ডিজিটাল মানচিত্রে উপস্থাপন ও মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। যা নীতি নির্ধারকদের একটি নির্দিষ্ট টুলস হিসেবে ব্যবহার হবে। এর মাধ্যমে নীতি নির্ধারকরা সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন— দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলের কোন স্থানে পানির নিরাপত্তা কেমন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ জনগণও নির্দিষ্ট অঞ্চল সম্পর্কে মানচিত্র থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। কর্মশালায় মুক্ত আলোচনায় আলোচকরা বলেন, খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার সাধারণ মানুষ সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। সেসব পদক্ষেপের মধ্যে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে— পলিথিন প্যাকেটে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা। প্রথমত পানি সংরক্ষণ হচ্ছে পলিথিনের প্যাকেটে, দ্বিতীয়ত বৃষ্টির এ পানি ধরার বিভিন্ন উৎসের মধ্যে রয়েছে খড়ের ঘরের চালা থেকে গড়িয়ে পড়া পানি। এ বিষয়গুলো গবেষণায় প্রধান্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কর্মশালায় নারী সদস্য জোনাকী রায় বলেন, ‘খুলনার দাকোপসহ উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানি সংকট মারাত্মক। সমস্যার সমাধান হওয়া জরুরি।’ এ প্রকল্প থেকে এ অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানি সদস্যার প্রকৃত সমাধান বেরিয়ে আসবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। সাংবাদিক ও গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, ‘খুলনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানি সমস্যার সমাধানে এ পর্যন্ত অসংখ্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার প্রায় সবগুলোই বিফল হয়েছে। পানি নিরাপত্তার এ গবেষণায় ওই প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিতকরণের উদ্যোগ থাকলে ভবিষ্যতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।’





