তহীদ মনি ॥ যশোরকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে কোটি টাকা ব্যয়ে করা হলেও জেলা প্রশাসনের এই মহতি উদ্যোগটি সফলতার মুখ দেখেনি। ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণার দুই বছর পর এখন ভিক্ষুকে গিজ গিজ করছে যশোর শহর। প্রয়োজনীয় অর্থ ও নজরদারির অভাব এবং পেশাদার ভিক্ষুকদের কারণে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশেষ করে করোনা হানা দেয়ার পর দরিদ্রের একটি নতুন শ্রেণি জন্ম নিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বেঁচে থাকার তাগিদে বেছে নিচ্ছেন ভিক্ষাবৃত্তি। আবার অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে অনেকটা বিনা শ্রমে অর্থ উপার্জনের জন্যে কাঁধে নিয়েছেন ভিক্ষার ঝুলি। মাত্র দু’বছর আগে যশোর শহরের অনেক স্থানে চোখে পড়তো ‘ভিক্ষুকমুক্ত যশোর’ লেখা সাইনবোর্ড, ব্যানার ও দেওয়াল লিখন। এখন আর সেটা চোখে পড়ে না। শহরের যত্রতত্র দেখা যায় ভিক্ষুকের ভিড়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী রোগাক্রান্ত ছোটবড় নারী ও পুরুষ ভিক্ষুক এখন শহরে গিজ গিজ করছে। অনেক সময় জনবহুল স্থানে কিছু নারী ভিক্ষুক দেখা যায়, যাদের সাথে শিশু থাকে। এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের কাছে খাবার কেনার টাকা চায়।
যশোর জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ভিক্ষুকমুক্ত যশোর গড়ার কাজ শুরু হয়। এ লক্ষ্যে ৩ নভেম্বর মাসে ১ম সভা হয়। এরপর বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, চেয়ারম্যান, মেম্বার, জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নিয়ে ভিক্ষুকের তালিকা তৈরি এবং বিভিন্নভাবে তাদের পুনর্বাসিত করার কাজ শুরু হয়। নারী-পুরুষ, বয়স, সক্ষমতা বিবেচনায় একেকজনকে একেক রকম সহায়তা দেয়া হয়।
সূত্র অনুযায়ী জেলায় এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯শ’ ১৯ জন। এর মধ্যে যশোর সদরে ছিল পৌর এলাকাসহ ৪শ’ ৫১ জন। অভয়নগরে ৪শ’ ৬ জন, মনিরামপুরে ৫শ’ ৫৪ জন, কেশবপুরে ৩শ’ ৬৩ জন, ঝিকরগাছায় ১শ’ ৮৬ জন, শার্শায় ৩শ’ ১৯ জন, বাঘারপাড়ায় ২শ’ ৮৪ জন ও চৌগাছায় ২শ’ ১৩ জন ভিক্ষুক ছিল। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে জেলা প্রশাসনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই ভিক্ষুকদের পুনর্বাসিত করতে ১ কোটি ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭শ’ ৩৯ টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদন অনুসারে ওই সময় পুনর্বাসন কাজটি অব্যাহত রাখতে আরও ৪০ লাখ টাকার প্রয়োজন ছিল। যা পাওয়া যায়নি। মূলত এরপর থেকে ধীরে ধীরে যশোরের ভিক্ষ্কুমুক্ত প্রকল্পটি স্তিমিত হয়ে যেতে থাকে। খরচ হওয়া টাকার উৎস সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভাগীয় কমিশনারের দেয়া ১১ লাখ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১ দিনের বেতন, ৩৪ লাখ ৮২ হাজার ৪শ’ ৫৭ টাকা, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ও বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে আরও প্রায় ৬৭ লাখ ৩ হাজার টাকা পাওয়া যায়। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সেলাই মেশিন, গরু, ছাগল, মুদি দোকান, ফেরি করে বিক্রির মালামালসহ বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন ধরনের মালামাল কেনার সহায়তা দেয়া হয়। তারপরও এতবড় ও মহতি উদ্যোগটি সফলতার মুখ দেখেনি। সরেজমিনে যশোর শহর ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী ভিক্ষুকের চলাচল। বিশেষ করে বৃহস্পতিবারে শহরে উপচে পড়ে ভিক্ষুক। রাজা নামে একজন দোকানি বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল অবধি ভিক্ষুকের ভিড় থাকে। এক টাকা করেও দিয়ে দেখেছি, কোন কোনদিন দেড় থেকে দু’শ’ টাকা ব্যয় হয়। মুদি দোকানি আইয়ুব বলেন, প্রতিদিনই শুধু ভিক্ষুককে ২০/৩০ টাকা দিতে হয়। একই ধরণের কথা বলেন, আলিম, কিশোরসহ অনেকে। গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে পোস্ট অফিস পাড়ায় আধাঘন্টা দাঁড়িয়ে অন্তত ১৫ জন ভিক্ষুকের সাথে কথা হয়। এরা কেউই পুনর্বাসনের টাকা বা সহায়তা পায়নি বলে জানায়। এদের মধ্যে তিনজন জানায়, তারা সম্প্রতি ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছে। সবাই রেলগেট, খড়কি, রেলস্টেশন, চাঁচড়া এলাকায় থাকে। ভিক্ষুকের একটি বড় অংশ সাতক্ষীরা, ফরিদপুরের। কেউ কেউ গোপালগঞ্জ ও যশোরের মনিরামপুর, ঝিকরগাছা এলাকার।
পুনর্বাসন ও বর্তমানে ভিক্ষুক বৃদ্ধি সম্পর্কে প্রেসকাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন বলেন, অনেকেই পেশাদার ভিক্ষুক। চেষ্টা করেও তাদের ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করা যায় না। সুযোগ পেলে আবার পুরাতন পেশায় ফিরে যায়। করোনার কারণেও নতুন কিছু ভিক্ষুক তৈরি হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, ভিক্ষুকমুক্ত যশোর গড়ার জন্য সকলকেই মিলেমিশে কাজ করতে হবে। এর আগে সে কর্মসূচি শুরু হয়েছিল তা অব্যাহত থাকা উচিত।
যশোর জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ফলোআপের অভাবে ও জনবল কম থাকায় ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এ রকম পুনর্বাসন প্রকল্পের জন্যে অর্থের প্রয়োজন। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে যার ঘর নেই, তার ঘর করে দেয়া হচ্ছে এবং দরিদ্র মানুষের সমস্যা জানার পর জেলা প্রশাসন থেকেও যথাসম্ভব সহায়তা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে কোন কোন অঞ্চলের তুলনায় যশোরে অতটা বেশি ভিক্ষুক নেই। করোনার কারণে অনেক চলমান ও নিয়মিত কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও সরকারকে ভিক্ষুকমুক্ত করার কাজটি তিনি পুনরায় শুরু করতে চান বলে জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, যশোরের অনেক মানুষ সহায়তা করার ক্ষমতা রাখেন। তারা পাশে এসে দাঁড়ালে পুনর্বাসনের মাধ্যমে যশোরকে ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব।





