লোকসমাজ ডেস্ক॥ নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারকে টালমাটাল অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে চাহিদায় রেকর্ড পতন জ্বালানি পণ্যটির দাম কমিয়ে দেয়। তবে বাজার বিশ্লেষকরা আশা করেছিলেন, ২০২০ সালের শেষ নাগাদ কিংবা আগামী বছর করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে তাদের সেই আশা ফিকে হতে শুরু করেছে। শীত মৌসুমের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয় এরই মধ্যে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে। প্রতিদিনই রেকর্ডসংখ্যক রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। ফলে আগামী দিনগুলোয় বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমনটা হলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার নতুন করে ধাক্কা খাবে। কমতে পারে জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা ও দাম। এ সম্ভাবনা মাথায় রেখে গোল্ডম্যান স্যাকস ও সিটি গ্রুপের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২১ সালের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য দামের প্রাক্কলন কমিয়ে এনেছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এসব প্রতিষ্ঠান বলছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানোর আশা সুদূরপরাহত।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার ধাক্কা খেতে শুরু করে। ওই সময় চীন ছাড়িয়ে ইউরোপের দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ছিল করোনা সংক্রমণ। পরে পুরো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে তছনছ করে করোনার বিশ্বজুড়ে বিস্তার ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) করোনা সংক্রমণকে মহামারী ঘোষণা করে। সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনে চলে যায় একের পর এক দেশ। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। থমকে যায় যোগাযোগ ও পরিবহন খাত। স্থবির হয়ে পড়ে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা কমতে শুরু করে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, করোনার কারণে চলতি বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদায় যে হারে পতন দেখা গেছে, তা ইতিহাসে কখনই ঘটেনি। বিশেষত দেশে দেশে যানবাহন বন্ধ থাকা ও কারখানাগুলোর কার্যক্রম সীমিত হয়ে আসায় জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা হু হু করে কমতে শুরু করে।
চাহিদা পতনের সাথে পাল্লা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও কমতে শুরু করে। এ ধারাবাহিকতায় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জ্বালানি পণ্যটির ব্যারেল শূন্য ডলারের নিচে নেমে যায়। অর্থাৎ পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি তেলের সাথে সাথে এর পরিবহন ব্যয়ও ক্রেতাদের পরিশোধ করেছে। জ্বালানি পণ্যটির ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।
নজিরবিহীন এ পরিস্থিতিতেও আশার কথা শুনিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য, ২০২০ সালের শেষ নাগাদ কিংবা আগামী বছর ঘুরে দাঁড়াতে পারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি। বাড়তে পারে দাম। সেই অনুযায়ী পূর্বাভাসও দিয়েছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে বছরের শেষ ভাগে এসে বাস্তবতা বিবেচনায় সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেছে পূর্বাভাসকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস এর আগে বলেছিল, ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৫৯ ডলার ৪০ সেন্টে। আর প্রতি ব্যারেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) গড় দাম ৫৫ ডলার ৯০ সেন্ট প্রাক্কলন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দুই ধরনের জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য গড় দামের পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে গোল্ডম্যান স্যাকস। প্রতিষ্ঠানটি এখন বলছে, ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৫৫ ডলারে। আর ডব্লিউটিআইয়ের সম্ভাব্য গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৫২ ডলার ৮০ সেন্টে।
একই পথে হেঁটেছে মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপও। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে বলেছিল, আগামী বছর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের গড় দাম ৫৪ ডলার হতে পারে। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি এর গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার কমিয়ে ৪৯ ডলারে নামিয়ে এনেছে।
সিটি গ্রুপের প্রতিবেদনে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দামের প্রাক্কলনও কমানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ২০২১ সালে আন্তংর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটির গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৫৪ ডলারে। আগের প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি ব্রেন্ট ক্রুডের সম্ভাব্য গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৫৯ ডলার প্রাক্কলন করেছিল।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস কমিয়ে আনার পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে করোনা মহামারীর বর্তমান পরিস্থিতি। শীত শুরুর সাথে সাথে মহামারী পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। মাঝে সংক্রমণ কমে আসতে শুরু করেছিল। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয় রোগী রেকর্ড পরিমাণ বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুও। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করছে। এরপর দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা লাগতে পারে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। শীত বাড়ার সাথে সাথে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে লকডাউন আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতি জ্বালানি তেলের চাহিদায় ফের ধস নামাবে। ফের স্থবির করে দিতে পারে অর্থনীতির গতি। মূলত এটাই জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য দামের প্রাক্কলন কমিয়ে আনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
এ বিষয়ে রয়টার্স আয়োজিত কমোডিটি ট্রেডিং সামিটে গানভর গ্রুপের প্রধান নির্বাহী ত্রোবজর্ন ট্রনকিউভিস্ট বলেন, করোনা সংক্রমণ কমে আসা ও দ্রুত ভ্যাকসিন প্রাপ্তির প্রত্যাশা সবার মনে আশার সঞ্চার করেছিল। তবে শীত মৌসুমের শুরুতেই সেই আশা উবে গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এখন ভ্যাকসিন নিয়েও মানুষের মধ্যে আশা ফিকে হয়ে এসেছে। ফলে আগামী দিনগুলোয় সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রভাব পড়বে জ্বালানি তেলের বাজারেও। সহসাই বাজার পরিস্থিতিতে গতি ফেরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও তা ঘিরে সম্ভাব্য অনিশ্চিত পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন একটা আশা ছিল। তবেক বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর অনিশ্চিত অবস্থা রয়ে গেছে, কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম খুব একটা বাড়েনি। তার ওপর করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ নতুন করে চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। ফলে জ্বালানি পণ্যটির দাম যে হারে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, বাস্তবে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
রয়টার্স, অয়েলপ্রাইসডটকম ও ব্লুমবার্গ অবলম্বনে





