ঝিনাইদহে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকায় ভাগ বসাচ্ছেন ইউপি সদস্যরা !

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ ॥ নজরুল ইসলাম এককালীন প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়েছেন ৯ হাজার টাকা। অগ্রণী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের পর তার কাছ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (ইউপি) এক হাজার টাকা নিয়ে নেন। একই কথা জানালেন বিধবা রোকেয়া খাতুন ও বাক প্রতিবন্ধী লিয়াতক আলী। নতুন ভাতাভোগী হলেই তাদের কাছ থেকে ৫শ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত কেটে রাখা হয়।
এই চিত্র ঝিনাইদহের প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। কখনো সমাজসেবা কর্মকর্তা বা ইউপি চেয়ারম্যানদের নাম ভাঙিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকেন। ইউপি সদস্যদের এই দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে ইউপি সদস্যরা গ্রামাঞ্চলে এই অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পায় না ভুক্তভোগীরা। কারণ বেশির ভাগ ইউপি সদস্য রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে প্রভাবশালী। আবার ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথেও রয়েছে তাদের সখ্যতা।
ঝিনাইদহ জেলা সমাজসেবা অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত ঝিনাইদহ জেলায় নতুন করে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন ২০ হাজার ৭৩ জন। গত জুন মাস থেকে তারা ভাতা পাচ্ছেন। এর মধ্যে ৬ উপজেলায় নতুন বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ৪ হাজার ৯১৪ জন, বিধবা ভাতা পাচ্ছেন ৪ হাজার ৮৫৮ জন ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন ১০ হাজার ৩০১ জন। নতুন ভাতাপ্রাপ্ত সকলেরই টাকা উত্তোলনের সময় ইউপি সদস্যদের কমবেশি ভাগ দিতে হয়েছে। গড়ে ৫০০ টাকা করে জনপ্রতি ইউপি সদস্যরা নিলে হিসাব দাঁড়ায় কোটি টাকার ওপরে।
ভাতাভোগীদের অভিযোগ, কখনো জোর করে আবার কখনো মিষ্টি খাওয়ার নামে ইউপি সদস্যরা টাকা নিয়ে থাকেন। অনেক সময় ভাতা করে দেওয়ার নাম করে আগে থেকেই আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ভিজিএফ, ভিজিডি, ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড ও সরকারি বাড়ি করে দেয়ার নাম করে চেয়ারম্যান মেম্বাররা অবলীলায় টাকা হাতিয়ে নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। ইউপি মেম্বারদের টাকা গ্রহণের বিষয়ে ঝিনাইদহ সদরের হলিধানী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান মতি বলেন, আমরা স্বচ্ছতা আনার জন্য মাইকিং করি। আবার কোনো সদস্যের এমন সংশ্লিষ্টতা পেলে ভাতার কার্ড বাতিল করে দিই। তারপরও রোধ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, যে সব ইউপি সদস্য এমন অনৈতিক কাজ করেন তাদের সদস্য পদ থাকা উচিৎ নয়। বিষয়টি নিয়ে ঝিনাইদহ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল লতিফ শেখ বলেন, ‘ইউপি মেম্বারদের এই দুর্নীতি প্রমাণহীন। অহরহ অভিযোগ আমাদের কানে আসলেও আমরা প্রমাণ করতে পারি না। ফলে তারা পার পেয়ে যান। যারা টাকা দেন (নতুন ভাতাভাগী) তারা স্বীকার না করায় মেম্বারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না।’ তিনি আরও জানান, ‘আমরা বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতায় স্বচ্ছতা আনতে সরেজমিন যাচাই বাছাই করছি। এই কাজে অনেকটা সফল হয়েছি।’ তিনি বলেন, আগামীতে ভাতাভোগীরা বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাবেন। ফলে ইউপি সদস্যদের দুর্নীতি কমে আসবে বলে উপ-পরিচালক আব্দুল লতিফ শেখ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ভাগ