লোকসমাজ ডেস্ক॥ হালকা বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে কবর। চরে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল। ওপর দিয়ে হয়েছে আসা-যাওয়ার রাস্তা। ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আস্তানাও দেখা গেলো। সীমানা প্রাচীর ভেঙে যাতায়াতের পথ বানিয়েছে স্থানীয়রা। খালি জায়গায় হচ্ছে সবজির চাষ। কে বলবে এতসবের মাঝে শায়িত আছেন জাতির সেরা সন্তানেরা! শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের এমন জীর্ণদশা নিয়ে মাথাব্যথা নেই কর্তৃপক্ষেরও। গত ৩১ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, কবরস্থানের প্রবেশমুখে ভিক্ষুকদের জটলা। গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশের ডান পাশে চায়ের দোকানে আড্ডায় মগ্ন কিছু লোক। দোকানের সামনে দিয়ে কবরস্থানে যাওয়ার রাস্তায় জমে আছে ময়লার স্তূপ। কিছু ময়লা পানিতেও ভাসছে। অনেক কবর ডুবে আছে পানিতে। মাটিও সরে গেছে বেশকটির। কিছু কবরে বেড়া ভেঙে পড়েছে। রাস্তার পানি ও ময়লা জমে কবরের কাছে যাওয়াটাও রীতিমতো কষ্টসাধ্য।
ওই দিনই মৃত বাবার কবর জিয়ারত করতে আসেন মিরপুরের বাসিন্দা মাসুদ আহমেদ। কবরস্থানে গিয়ে দেখেন ডুবে গেছে বাবার কবর। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দোয়া-দুরুদ পড়ে একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
মাসুদ বলেন, ‘বাবার কবরের এই অবস্থা দেখে সন্তান হিসেবে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। কিছু করার নেই। কাকে কী বলবো?’ শুধু মাসুদ নন, তার মতো আরও অনেকে স্বজনের কবরের এই অবস্থা দেখে ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানিয়েছেন। কবরস্থানের একটু ভেতরে এগোলে চোখে পড়বে বড় অক্ষরে লেখা ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত স্থান’। ২০১৬ সালে জায়গাটি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের জন্য সংরক্ষণ করে দেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ভেতরে গিয়ে দেখা গেলো এক বৃদ্ধা কাপড় শুকোতে দিচ্ছেন। তার পাশে একজন শুকোতে দিয়েছে কদবেল। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত হলেও সেখানে দেখা গেলো সাধারণ মানুষের কবরও।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত কবরস্থানের পাশের রাস্তায় অবাধে চলছে রিকশা। সেই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলে দেখা যায় কবরের পাশের রাস্তায় ঘুমিয়ে আছে কয়েকজন ভবঘুরে। তাদের অনেকের গায়ের পোশাক নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় সেখানে জিয়ারত করতে আসা লোকেরা পড়ছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। কবরস্থানের পশ্চিম দিকে দিয়াবাড়ি সড়কের পাশের কয়েক জায়গায় সীমানা প্রাচীর ভাঙা। সেই পথগুলো দিয়ে যাতায়াত করছে মানুষ। জানা গেছে, কবরস্থানের ভেতরে রয়েছে ডিএনসিসি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কলোনি। তারা এবং বাইরের বাসিন্দারা গোলারটেক ও মিরপুর-১ নম্বরে সহজে যাতায়াতের জন্য দেয়াল ভেঙে পথ তৈরি করেছে। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে মিরপুর-১ যাচ্ছেন কবির হোসেন। কারা দেয়াল ভাঙলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তা বলতে পারবো না। মিরপুর-১ যাবো। রাস্তা দিয়ে গেলে অনেক ঘুরতে হয়, কবরস্থানের ভেতর দিয়ে শর্টকাট রাস্তা।’ কবরস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে অনেক দোকান ও ঘর। সামনের জায়গায় চাষ করা হয়েছে সবজি এবং গোখাদ্য। কবরস্থানের ভেতরেই এখানে সেখানে চলছে আড্ডা।
কবরস্থানের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে আছেন সিনিয়র মোহরার সানোয়ার হোসেন। শনিবার তার রুমে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে এসব অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘দেয়ালের ভাঙার বিষয়ে আমি অফিসে (ডিএনসিসি) জানিয়েছি এবং কয়েকবার নোটও দিয়েছি। মার্চে সংস্কার কাজ শুরু হওয়ার কথাও ছিল। কিন্তু আগে যে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন তিনি এখন নেই। তার জায়গায় আরেকজন এসেছেন। এখন তিনিই ভালো বলতে পারবেন।’ পানির নিচে কবর ডুবে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘কিছু কবর ডুবেছে এটা ঠিক। পানি বের হওয়ার যে নালা সেটা দিয়ে ধীরগতিতে পানি সরে। এই বিষয়েও আমি অফিসে জানিয়েছি।’ মাদকসেবীদের আড্ডার বিষয়ে সানোয়ার বলেন, ‘দেয়াল নেই। পশ্চিমের গেট ও বাউন্ডারি নেই। কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েছি। ভবঘুরেদের সঙ্গে বখাটেরাও আসা-যাওয়া করে। এজন্য যে নিরাপত্তা কর্মী দরকার সেটাও জানিয়েছি।’ মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দায়িত্বে আছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেন। এই বিষয়ে জানতে ডিএনসিসি প্রধান সমাজ কল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা তাজিনা সারোয়ারকে ফোন করা হলে তিনি অসুস্থ বলে কথা বলতে রাজি হননি।





