করোনার ভ্যাকসিন চুক্তি : আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

লোকসমাজ ডেস্ক॥ সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে করোনায় অনেকটাই স্থবির জনজীবন। ভয় কাটিয়ে মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করলেও করোনার ঝুঁকি কিছুতেই কাটছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা আসার আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সচেতনতাই করোনা থেকে দূরে থাকার সবচেয়ে উত্তম পথ। টিকা এলেই কেবল মানুষ নির্ভয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। বৃহস্পতিবার করোনার ভ্যাকসিন পেতে সরকার উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করায় আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই চুক্তির ফলে সঠিক সময়ে টিকা পাওয়ার পথ সুগম হলো। একইসঙ্গে দেশীয় একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এই টিকা সরবরাহে যুক্ত হওয়ায় মানুষের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়বে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনার ভ্যাকসিন পেতে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশি ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে। এই চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে দেড় কোটি লোককে ৩ কোটি ডোজ টিকা দেয়া হবে।
ভ্যাকসিন পেতে করা চুক্তির বিষয়ে করোনাভাইরাস বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, যে ভ্যাকসিনটি পেতে চুক্তি করা হয়েছে তা ভালো একটি ভ্যাকসিন। সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা ভালোভাবেই দেখছি। এতোদিন আমরা এই ধরনের একটি চুক্তির অপেক্ষায় ছিলাম। এই চুক্তির মাধ্যমে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আসবে। আমাদেরকে আরো ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে হবে ও সংরক্ষণ রাখতে হবে। এই চুক্তি মানুষের মধ্যে নিশ্চয় আশার আলো জাগাবে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ভ্যাকসিনের পাশাপাশি আমাদেরকে মাস্ক পরতে হবে।
করোনা ভ্যাকসিনের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, সরকারের এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এ চুক্তির মাধ্যমে মানুষ আশার আলো দেখবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন যাতে কার্যকর হয় এবং জনগণ যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। প্রথম ধাপে ৩ কোটি ডোজ দেয়া হবে। এই টিকা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকর্মী, অসুস্থ, বয়স্করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা ও সাংবাদিকরা যাতে পান সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তবে পর্যায়ক্রমে টিকা সবাইকে দেয়ার পরামর্শ দেন এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএ ফয়েজ ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য অগ্রিম চুক্তিকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে বলেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শেষের দিকে এবং তা কার্যকরী বলে আশা করা যাচ্ছে। এটা সফল হলে পৃথিবীর বহু দেশ ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতা করবে। বাস্তবতা হচ্ছে তখন একটা সংকট দেখা দিবে। বাংলাদেশ অগ্রিম চুক্তি করে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ভ্যাকসিন প্রদানের ক্ষেত্রে সরকার যে নীতিমালা করেছে তা সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, ফ্রন্টলাইনার ও বয়স্ক লোকজন এতে অগ্রাধিকার পাবে বলে আশা করা যায়। ডা. এমএ ফয়েজ বলেন, বেক্সিমকো নিঃসন্দেহে একটি ভালো এবং নির্ভরযোগ্য কোম্পানি। বাংলাদেশে অনেক রোগের ওষুধ নেই। আবার সরকার চাইলেও সব রোগের ওষুধ বা টিকা আনতে পারে না। বেক্সিমকো ভ্যাকসিন আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে।
ভ্যাকসিনের চুক্তি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে অন্তত দেড় কোটি মানুষ ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে- এটা অবশ্যই ভালো খবর। এতে কিছু মানুষের হলেও জীবন ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে। যেখানে রোগ ঠেকাতে অনেক উদ্যোগই কাজে আসলো না। এখন ভ্যাকসিন আসার খবর মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছে। তিনি বলেন, ৩ কোটি ডোজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য উৎস থেকে আরো ২ কোটি মানুষের ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা সম্ভব। এই বিষয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরো উল্লেখ করেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি উন্নতমানের। এটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য কার্যকরী হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে এই দেড় কোটি সুবিধাভোগী কারা হবে তা নির্ধারণে সরকার যে নীতিমালা তৈরি করেছে তা কঠোরভাবে অনুসরণের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, কয়েকটি ধাপ ও উপধাপে ভাগ করে সুবিধাভোগীদের পর্যায়ক্রমে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনা হবে। এজন্য কমিটি গঠন করেছে সরকার। এখন করোনাভাইরাসের টিকার প্রয়োগ স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে হওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক এ ব্যাপারে বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে আমরা ভ্যাকসিনের বিষয়ে নিশ্চিত হলাম। তবে চুক্তি হয়ে গেছে এই নয় যে, আমরা বসে থাকবো। আরো বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে হবে। আমাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। ভ্যাকসিনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রাথমিকভাবে মাত্র দেড় কোটি লোককে টিকা দিবে। দুই ডোজ করে দিলে ১৭ কোটি লোকের ৩৪ কোটি ভ্যাকসিন দরকার হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে প্রথমে সম্মুখযোদ্ধারা পাবেন। তারপর অসুস্থ ও বয়স্করা পাবেন। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন লাগবে। ভ্যাকসিনের মান কার্যকর হতে হবে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং সংস্থাটির উপদেষ্টা ডা. মুস্তাক হোসেন এ বিষয়ে বলেন, এই চুক্তিতে ৩ কোটি ডোজ টিকা আসবে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি করোনাভাইরাসের এই ভ্যাকসিন ভালো। দেড় কোটি মানুষ পাবেন। ভ্যাকসিনের জন্য আমাদের সব ধরনের রাস্তাই খোলা রাখতে হবে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিনামূল্যে, স্বল্প মূল্যে টিকা কিনে মজুত গড়ে তুলবে কোভ্যাক্স (কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস)। সেখান থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে সমান বণ্টন করা হবে।

ভাগ